বিশেষ প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ, ঢাকা ২১ জুলাই, ২০২৬
গত জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এবং আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির অসাধু চক্র সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল। আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের আবেগ জড়ানো স্মৃতিকে পুঁজি করে দেশজুড়ে দায়ের করা হয়েছিল একের পর এক ভুয়া ও কাল্পনিক মামলা। তবে এবার সেই চক্রের বিরুদ্ধেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যারা নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায়ের বাণিজ্য পেতেছিল, তদন্তে সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর এখন তারাই উল্টো আইনি মারপ্যাঁচে ফেঁসে যাচ্ছে।
১১০টি ভুয়া মামলা শনাক্ত: অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশেষ তদন্তে এ পর্যন্ত অন্তত ১১০টি সম্পূর্ণ ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতির তথ্য।
অনুসন্ধানের তথ্যানুযায়ী, গণপিটুনিতে নিহত চোর, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তি কিংবা বহু বছর আগে স্বাভাবিক বা অন্য কারণে মারা যাওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও ‘জুলাই আন্দোলনের শহীদ’ সাজিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি জীবিত ও সুস্থ মানুষকে ‘নিখোঁজ’ বা ‘খুন’ দাবি করে আদালতে শত শত নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
জালিয়াতির কয়েকটি খণ্ডচিত্র:
দুর্ঘটনায় মৃত্যু, অথচ জুলাই শহীদ: সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিকে আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে নিহত বলে দাবি।
আগে মৃত নেতার পুনরুত্থান: অতীতে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করা বিএনপি বা অন্য দলের নেতাকর্মীদের নতুন করে জুলাই আন্দোলনের ভুক্তভোগী সাজানো।
জীবিত মানুষই মামলার ‘লাশ’: বাস্তবে জীবিত ও সুস্থ আছেন এমন ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অপচেষ্টা।
যেভাবে চলতো মামলার ‘বাণিজ্য’
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র সুপরিকল্পিতভাবে এই ভুয়া মামলাগুলো পরিচালনা করে আসছিল। এই চক্রের মূল উদ্দেশ্যই ছিল সাধারণ ও বিত্তবান মানুষকে মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
চক্রটি প্রথমে আদালতে বা থানায় একটি কাল্পনিক এজাহার দায়ের করতো। এরপর সেই এজাহারের কপি আসামিদের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হতো। ভুক্তভোগী নিরপরাধ ব্যক্তিরা আইনি হয়রানি এড়াতে টাকা দিতে রাজি হলে, চক্রটি আবার আদালতের মাধ্যমে সেই আসামির নাম প্রত্যাহারের আবেদন করতো। তবে পুলিশের নিবিড় তদন্তে বাদী, ভিকটিম এবং ঘটনাস্থল—সবই ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।
কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখে ভুয়া প্রবাসীরা ও চক্রের সদস্যরা
এই জঘন্য বাণিজ্যের বিরুদ্ধে এবার কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর প্রস্তুতি চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন:
“পুলিশের বিশেষ ইউনিটের বেশ কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন ইতিমধ্যে আমাদের হাতে এসেছে। সেখানে অসংখ্য ভুয়া বাদীর সন্ধান মিলেছে। এই ভুয়া বাদী ও প্রতারক চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু মামলার বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলাও দায়ের করা হয়েছে।”
উপসংহার ও পর্যালোচনা
জুলাই আন্দোলনের মতো একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন ঘটনাকে পুঁজি করে যারা ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে চেয়েছিল, তাদের মুখোশ উন্মোচন হওয়া বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভুয়া মামলাগুলো একদিকে যেমন প্রকৃত শহীদ ও তাদের পরিবারের আত্মত্যাগকে কালিমালিপ্ত করে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কঠোর অবস্থান ভুয়া মামলার সংস্কৃতি বন্ধে এবং দেশের আইনশৃঙ্খলার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।