জুয়েল রাজ | লন্ডন, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে একটি উচ্চপর্যায়ের সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় ওয়েস্টমিনস্টারের ওয়ান গ্রেট জর্জ স্ট্রিটের গডফ্রে মিচেল রুমে ‘Safeguarding Democracy in Bangladesh: Rights, Freedoms and the Rule of Law’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে কানাডা ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স’ (GCDG)।
সংগঠনটির সভাপতি প্রফেসর ড. মো. হাবিবে মিল্লাতের উদ্বোধনী বক্তব্য এবং ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামের যোগাযোগ পরিচালক ক্রিস ব্ল্যাকবার্নের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর সাবেক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। এছাড়া সশরীরে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির এমপি বব ব্ল্যাকম্যান, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকা এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ বদরুল আহসান।
মানবাধিকার ও অর্থনীতির উদ্বেগজনক চিত্র সেমিনারে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা দেশের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আলোচনায় গত দুই বছরে দেশে প্রায় ৬০০ হত্যাকাণ্ড এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ৩ হাজার হামলার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়, যা উপস্থিত আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর পাশাপাশি সুইস ব্যাংকসহ বিদেশে অর্থ পাচার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়েও আলোচনা হয়।
‘সংস্কার নয়, প্রতিশোধ’ – অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন বক্তারা। অভিযোগ ওঠে, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের আড়ালে মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যাকে বক্তারা ‘রিফর্ম নয়, রিভেঞ্জ’ (সংস্কার নয়, প্রতিশোধ) বলে আখ্যায়িত করেন। বিরোধী মত দমনে রাজনৈতিক মামলা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিও সেমিনারে গুরুত্ব পায়।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: ‘নিউ পাকিস্তান’ হওয়ার শঙ্কা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকা সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় ও রাজনৈতিক পরিচয় হারিয়ে একটি ‘নিউ পাকিস্তানি জাতি’তে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিশেষ করে দীপু চন্দ্র দাসকে পুড়িয়ে হত্যা এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের কারাবন্দিত্বের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কথা জানান। সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর বক্তব্যে সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাংলাদেশ চরম ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হতে পারে।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার প্রত্যয় ও ৬ দফা দাবি অনলাইনে যুক্ত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক দৃঢ় বার্তা দেন। আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, জেল-জুলুম বা মৃত্যুর পরোয়া তিনি করেন না, দেশের মানুষের পাশেই তিনি থাকতে চান। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর থেকে সব ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের দাবি জানান। সংকট উত্তরণে তিনি সুনির্দিষ্ট ৬ দফা দাবি পেশ করেন:
১. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে স্বাভাবিক রাজনীতির সুযোগ দেওয়া। ২. মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি: দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং অবিলম্বে তাদের মুক্তি। ৩. রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ: আওয়ামী লীগসহ সব দলের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, মিছিল ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করা। ৪. সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বন্ধ করা। ৫. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এবং সরকারের সমালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা। ৬. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক নজরদারির আহ্বান অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ, সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে সেমিনারের সমাপ্তি টানা হয়।