Skip to main content

Brick Lane News

ঢাকার মাদক বাণিজ্যে ১৫ বছরের কম বয়সীদের ব্যবহার উদ্বেগজনক

ঢাকার মাদক বাণিজ্যে ১৫ বছরের কম বয়সীদের ব্যবহার উদ্বেগজনক

রাজধানীর মাদক ব্যবসায় শিশুদের জড়িয়ে পড়ার হার রীতিমতো শঙ্কার উদ্রেক করেছে। সম্প্রতি পিএলওএস ওয়ান (PLOS One) নামক আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা এর চেয়ে কম। ‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গবেষণায় ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় ঢাকার মাদক কারবারে যুক্ত ১ হাজার ১৬ জন ব্যক্তিকে সাক্ষাৎকার দেওয়া হয়েছে। এদের গড় বয়স ২৬ দশমিক ৭ বছর। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত বা তার নিচে। প্রায় ২৯ শতাংশ মাদক বিক্রেতা ফুটপাতে বসবাস করেন এবং ১০ শতাংশ নিজেকে ভাসমান বা গৃহহীন হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পেশায় যুক্ত নারী বিক্রেতাদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছেন যে তারা যৌন পেশার সঙ্গেও জড়িত। ঢাকা শহরে মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এক হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়েছে। এক হাজার ১৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির কথা জানিয়েছেন। ২৮৫ জন শুধু ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া ২২৮ জন গাঁজা ও ইয়াবা—দুটিই বিক্রির কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ২৫০ জন গাঁজা ও হেরোইন—দুটিই বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শিশুদের এই অপরাধমূলক কাজে টেনে আনার প্রধান কারণ হিসেবে বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। বিশেষ করে শিশু ও নারী বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক বা জবরদস্তির শিকার হওয়ার প্রবণতাও বেশ প্রবল। পুরুষ বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে সাধারণত আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সুযোগের অভাব মাদক কারবারে জড়ানোর মূল কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

মাদক বিক্রির ধরনে এলাকাভিত্তিক পার্থক্য রয়েছে। যেমন, পল্টন ও বসুন্ধরা এলাকায় গাঁজা বিক্রির আধিপত্য বেশি, অন্যদিকে ইয়াবা বিক্রির কেন্দ্রস্থল কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডা এলাকা। ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকা গাঁজা ও ইয়াবা—দুটোরই মিশ্র ব্যবসার জন্য পরিচিত। আবার সাভার ও পল্টন এলাকায় গাঁজা ও হেরোইন উভয়েরই সমান্তরাল কারবার দেখা যায়। ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ইয়াবা ও হেরোইন বিক্রিতে সম্পৃক্ততা বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণাটিতে মাদকের আন্তঃসীমান্ত রুটগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে পাটনার পথে ঢাকায় হেরোইন প্রবেশ করে, যা পরে সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিল এলাকায় ছড়ায়। গাঁজা আসে মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা হয়ে। অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে টেকনাফ এবং ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে ইয়াবা বাংলাদেশে ঢোকে, যা সিলেট ও সুনামগঞ্জের পথে ঢাকায় পৌঁছায়। এই নেটওয়ার্ককে গবেষণায় ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ পাচার চক্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহের মতো সীমান্ত পথেও মাদক আসা অব্যাহত রয়েছে। পরে দুটি রুট ঢাকায় এসে মিলিত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় মাদকটি ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষণার প্রধান নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর মতে, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার মাদক সিন্ডিকেটের একটি কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে সিন্ডিকেটগুলো শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই গবেষণায় ‘পারপাসিভ’ ও ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, এই তথ্যগুলো পুরো শহরের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে গণ্য করা যাবে না, বরং এগুলো মাদক ব্যবসার একটি অশুভ চিত্র তুলে ধরে।

গবেষণা দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন গ্যারেথ জে হল্যান্ডস, মো. আলামিন, মো. রোকনুজ্জামান, মাহদী হাসান এবং সামিয়া আক্তার। সামগ্রিকভাবে এই গবেষণার তথ্য ঢাকার মাদক বাণিজ্যের ভয়াবহ কাঠামো উন্মোচন করেছে, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি শিশু ও নারীদের শোষণের শিকার হওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।