রাশিয়ায় আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শাসন কাঠামোর এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সামনে চলে এসেছে। যদিও নির্বাচনের ফলাফলের বিষয়ে বড় কোনো অনিশ্চয়তা নেই, তবুও ক্রেমলিনের জন্য এই ভোট আয়োজন করাটা অপরিহার্য। পুতিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা মূলত ‘ম্যানেজড ডেমোক্রেসি’ বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নির্বাচন বা জনগণের সমর্থন না থাকলেও তার শাসনকে বৈধতা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার নির্বাচনে পুতিনপন্থী দল ইউনাইটেড রাশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া নিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমেই এই ভোটের ফল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কারচুপির মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত করা সম্ভব হলেও, যদি জনগণের বাস্তব মনোভাবের সঙ্গে সরকারি ফলাফলের বিস্তর ফারাক তৈরি হয়, তা শাসকের জন্য বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে, ইয়াবলোকো দলের মতো উদারপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রাখাটা সরকারের অস্বস্তিরই বহিঃপ্রকাশ। দলটিকে সুপ্রিম কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নির্বাচনে বাধা দিয়েছে। উল্লেখ্য, ইয়াবলোকো সর্বশেষ ২০০৭ সালে ডুমায় প্রতিনিধিত্ব পেয়েছিল এবং এখনো স্থানীয় পর্যায়ে তাদের কিছু প্রতিনিধি সক্রিয় রয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়িয়েছে। ইয়াবলোকোর মতো ছোট একটি যুদ্ধবিরোধী দলকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে, ক্রেমলিন জনসমর্থন নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন। তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শান্তি, কূটনীতি ও যুদ্ধবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্রেমলিনের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরেও স্পষ্ট। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ফলে দেশটির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতা লুকিয়ে রাখা কঠিন করে তুলেছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। রুশ সামরিক হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হলেও, বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটি প্রায় ১৫ লাখে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হয়। স্বেচ্ছাসেবকের ঘাটতি মেটাতে সেনা নিয়োগকারীরা জোরজবরদস্তি ও প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও নির্বাচনের পর নতুন করে গণসংহতি বা রিজার্ভ সেনা মোতায়েনের গুঞ্জন কর্মকর্তারা নাকচ করে দিয়েছেন।
ক্রেমলিন এখন এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে বিরোধিতার সামান্যতম সুযোগও সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। পুতিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোটের ফল পেতে প্রশাসনিক সব ব্যবস্থাই সম্পন্ন। তবুও, পুতিনের জন্য জনগণের সমর্থনের বাস্তবতা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো—জনগণ যে তার সঙ্গে আছে, তেমন একটি দৃশ্য তৈরি করা। বাইরে থেকে রাশিয়ার এই শাসনব্যবস্থাকে লৌহকঠিন মনে হলেও, বিরোধী কণ্ঠ দমন এবং যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেওয়া এসব পদক্ষেপ আসলে ভেতরে থাকা গভীর দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়।