কাজল রশীদ
আয়নার সামনে দাঁড়ালেই জুয়েলের মনে হয়, কাঁচের ভেতরে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে, সে আসলে সে নয়। সে যেন কোনো এক অশুভ ছায়া, ভুল করে তার কাঁধে এসে ভর করেছে। এই মুখটা হাসলে আরও বেমানান লাগে। মনে হয়, কোনো এক নিষ্ঠুর ভাস্কর জোর করে তার ঠোঁটে উল্টো করে হাসি বসিয়ে দিয়েছে। মানুষ ভাবে জুয়েল হাসছে, অথচ সেই হাসির ভাঁজে যে এক গভীর বিদীর্ণতা লুকিয়ে থাকে, তা কারও চোখে পড়ে না।
লন্ডনের এই গুমোট শহরে জুয়েল অনেক বছর ধরে আছে। বাসে চড়া, অফিসের ইমেইল চেক করা, সুপারমার্কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করা সবই সে যন্ত্রের মতো করে যায়। কিন্তু এই শহরের মানচিত্রে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। জুয়েল যখন মানুষের ভিড়ে হাঁটে, তখন মনে হয় সে যেন স্বচ্ছ কোনো পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ তাকে দেখে, কিন্তু চেনে না। অফিসে সবাই তাকে চেনে ‘জরুরি প্রয়োজনে ডেকে নেওয়ার মানুষ’ হিসেবে। কেউ কোনো ফাইল হারিয়ে ফেললে বা মিটিংয়ের ডেডলাইন মিস করলে, দায়টা জুয়েলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া খুব সহজ। সে প্রতিবাদ করে না, কারণ সে নিজেও জানে না, ঠিক কোন পরিচয়ে সে প্রতিবাদ করবে।
সে কোনোদিন দল বেঁধে কসরত করেনি। জনপ্রিয় হওয়ার জন্য ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে চেঁচানো বা জেতার আনন্দে লাফানো এসব তার শরীর কোনোদিন শেখেনি। তার আনন্দ কখনোই উজ্জ্বল নয়; বরং তা প্রায় অদৃশ্য, যেমন দুপুরবেলায় জানালার কোণে জমাট বাঁধা বাতাস, যা থাকলেও কেউ আলাদা করে টের পায় না।
বাসায় ফিরলে দম বন্ধ হয়ে আসে। তার স্ত্রী লুভনা হয়তো ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কোনো এক সিরিয়ালে মগ্ন, অথবা ফোনে কার সাথে যেন হেসে কথা বলছে। জুয়েল ঘরে ঢুকলে লুভনা একবার চোখ তুলে তাকায়, তারপর আবার তার জগতে ফিরে যায়। এই নির্লিপ্ততাটুকু জুয়েলের গায়ের চামড়া ভেদ করে হাড়ের ভেতরে গিয়ে বিঁধে। একসময় জুয়েলও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল সে আসলে জুয়েল নয়, সে কেবল লুভনার সংসারের একটি ছায়াশরীর। লুভনার জীবনে তার থাকা বা না থাকা কোনো অর্থ বহন করে না।
শনিবারের বিকেলগুলো জুয়েলের জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক। লুভনা তাকে নিয়ে শপিংমলে যায়। হাজার হাজার মানুষের ভিড়। জুয়েল দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, লুভনা ড্রেসিংরুমে গিয়ে নতুন নতুন পোশাক পরে বেরিয়ে আসে আর জুয়েলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘কী রকম লাগছে?’ জুয়েল একটা মেকি হাসি দিয়ে বলে, ‘চমৎকার’। অথচ তার ভেতরটা তখন একরাশ শুন্যতায় ভরে থাকে। সে বোঝে না, এই যে সে প্রতিদিন নিজেকে ভেঙে ফেলছে, এর শেষ কোথায়? সে কি কেবলই একটা অস্তিত্বহীন ছায়া?
একদিন অফিসের মিটিংয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটল। প্রজেক্ট ভেস্তে যাওয়ার দায়ভারের আঙুলগুলো অজান্তেই জুয়েলের দিকে ঘুরে গেল। বস যখন জুয়েলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, জুয়েল কেবল মাথা নিচু করে রইল। তার সেই চুপ থাকাটা সবাই অপরাধ বলে ধরে নিল। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে লন্ডনের ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে সে যখন লন্ড্রি স্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, মনে হলো, দেয়ালের পলেস্তারা যেমন ফাটল ধরে ধীরে ধীরে গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ে, সেও তেমন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।
সেদিন রাতে হঠাৎ এলাকাতে বিদ্যুৎ চলে গেল। লণ্ডনের বাইরের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলো কাঁচের জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। লুভনা পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। নিঃশব্দে জুয়েল উঠে গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। জানালার ওপাশ থেকে আসা সেই ম্লান আলো এসে তার মুখে পড়ল। জুয়েল অনেকদিন পর খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের দিকে তাকাল। এই মুখের প্রতিটি ভাঁজে জমে আছে কত না বলা কথা, কতগুলো বছর যাতে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।
সে অনুভব করল, এই মুখটা যদি তার একান্ত নিজস্ব নাও হয়, তবে এই বেদনার মালিক তো কেবল সে-ই। এই কষ্ট, এই দীর্ঘ নীরবতা এগুলোই কি তার সত্য পরিচয় নয়? সে বুঝতে পারল, সে দুর্বল নয়, সে কেবল অসম্ভব ক্লান্ত। এতদিন সে যেটাকে পরাজয় ভেবেছে, এই মৌনতাই হয়তো তার একমাত্র প্রতিবাদ। সে যখন চুপ থাকে, তখন সে কোনো অপরাধ করে না, বরং নিজের সত্তাকে আগলে রাখে।
হঠাৎ মনে হলো, লুভনার কাছে তার অস্তিত্ব কোনো তাসের ঘর নয় যে ফু দিলেই উড়ে যাবে। তার নিজের ভেতরেও আগ্নেয়গিরির বারুদ আছে। জুয়েল আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এবার এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। মানুষ হয়তো তাকে আগের মতোই ডাকবে, কিন্তু জুয়েল জানে, এখন থেকে এই নীরবতা তার পরাজয় নয়, বরং নিজের সত্তাকে ফিরে পাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।পরদিন সকালে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের কলার ঠিক করল। আজ সে হাসিটাকে নকল করার চেষ্টা করল না। আয়নার ভেতরের মানুষটি আজ আর অপরিচিত নয়। সে মুচকি হাসল যে হাসিটা পুরোপুরি তার নিজের। বাইরের পৃথিবী হয়তো আগের মতোই থাকবে, কিন্তু এই যে নতুন করে বেঁচে ওঠার সংকল্প, এটাই তার গল্প। মুখটা আজও হয়তো সবার কাছে ধাঁধা হয়ে আছে, কিন্তু যে গল্পটা আজ জুয়েল লিখছে, তা সম্পূর্ণ তার নিজের।
জুয়েল বুঝতে পারল, এই চুপ থাকাটা এক বিশাল শক্তি। সে আজ থেকে নিজেকে আর কারও কাছে প্রমাণ করবে না। লুভনা হয়তো তাকে আজও একই চোখে দেখবে, কিন্তু জুয়েল জানে, সে ভেতরে ভেতরে অনেক বড় কোনো যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখল সকালের প্রথম আলো ফুটছে। আজকের সূর্যটা আগের দিনের মতো ফিকে নয়, আজকের আলোয় এক তীব্র তেজ আছে। সেই তেজে সে নিজেকে নতুন করে চিনল সে জুয়েল, যে এতদিন শুধু বেঁচে ছিল, কিন্তু আজ থেকে সে সত্যিকারের জীবন যাপন শুরু করবে। এই মুখটা তার হয়ে ওঠেনি এতদিন, কিন্তু আজ থেকে এই মুখটিই তার আত্মপরিচয়ের একমাত্র দলিল। সে হাসল, এবার সত্যি করেই হাসল। আয়নার মানুষটি তার সাথেই হাসল। অবশেষে তারা দুজন একাকার হয়ে গেল।