Skip to main content

Brick Lane News

মুর্দা খাটিয়া

মুর্দা খাটিয়া

IMG 0511 মুর্দা খাটিয়া

আনিসুর বুলবুল

‘হুজুর… দরজাটা খুলবেন? ভগবানের দোহাই লাগে…!’

কড়া নাড়ার শব্দটা এতটাই অস্থির ছিল যে মনে হচ্ছিল, দরজায় কেউ হাত নয়, বুক ঠুকছে।

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। শ্রাবণের শেষ দিক। টিনের চালের ওপর টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। মাদ্রাসার ছাত্ররা ঘুমিয়ে। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। গ্রামের রাত এমন সময়ে এতটাই নিস্তব্ধ থাকে যে একজন মানুষের হাঁপানোর শব্দও আলাদা করে শোনা যায়।

মাওলানা আবদুল কাদের বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখলেন, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন হরিপদ পাল। সত্তরের কাছাকাছি বয়স। সাদা ধুতি কাদায় মাখামাখি। কাঁধের গামছাটা ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। মানুষটা এমনভাবে হাঁপাচ্ছেন, যেন দৌড়ে আসতে আসতে বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে গেছে।

‘বাঁচান হুজুর… ও আর বাঁচবে না।’

মাওলানা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

‘কী হয়েছে?’

‘বুড়িটার শ্বাস উঠছে। অনেকক্ষণ ধরেই। গ্রামের ডাক্তার এসে বলল, এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু…’

বৃদ্ধ বাকিটুকু বলতে পারলেন না। গলাটা আটকে গেল।

এই গ্রামে রাতের বেলা অ্যাম্বুলেন্স আসে না। ফোন দিলেও বলে, রাস্তা কাদা। ভোর না হলে গাড়ি পাওয়ারও উপায় নেই।

মাওলানা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ঘুরে ভেতরে গিয়ে লাইটটা জ্বালালেন।

‘রফিক… সামিউল… নাঈম… সাদিক… ওঠো। সবাই ওঠো।’

ঘুমজড়ানো চোখে ছাত্ররা বেরিয়ে এল।

‘কী হয়েছে, হুজুর?’

‘একজন মানুষ অসুস্থ। হাসপাতালে নিতে হবে।’

এর বেশি কিছু বললেন না তিনি। শুধু মাদ্রাসার বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা মুর্দা খাটিয়াটির দিকে একবার তাকালেন। ছাত্ররা তাতেই বুঝে গেল।

খাটিয়াটি নামিয়ে তার ওপর একটি কাঁথা, একটি বালিশ আর একটি মোটা চাদর বিছিয়ে ফেলা হলো। মাওলানা পলিথিনও নিয়ে আসলেন।

কারও মুখে বিরক্তি নেই। শুধু ঘুম ভাঙা চোখে এক ধরনের উদ্বেগ।

ছোট্ট ছাত্র সাদিক পলিথিন খাটিয়ার সঙ্গে বাঁধতে গিয়ে বলল, ‘হুজুর, বৃষ্টি তো অনেক।’

মাওলানা শুধু বললেন, ‘বৃষ্টি মানুষের জন্য থামে না। মানুষও মানুষের জন্য থামতে পারে না।’

হরিপদ পথ দেখিয়ে সামনে হাঁটছিলেন।

তার বাড়িটা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। মাইল পাঁচেকের মধ্যে আর কোনো বাড়িঘর নাই।

চারদিকে কলাগাছ, সুপারি আর পুরোনো আমগাছ। উঠোনে পা রাখতেই কাঁচা মাটির গন্ধে ভরে গেল চারপাশ।

ঘরের ভেতর থেকে কষ্টের শ্বাসের শব্দ ভেসে আসছিল।

খাটের ওপর শুয়ে আছেন সরস্বতী দেবী। মুখটা কাগজের মতো সাদা। চোখ আধখোলা। বুকটা অনিয়মিতভাবে উঠছে-নামছে।

বৃদ্ধা মাওলানার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলেন।

চিনতে পারলেন কি না বোঝা গেল না।

হরিপদ ধীরে বললেন, ‘ও… এরা মাদ্রাসার হুজুর।’

বৃদ্ধার ঠোঁট কাঁপল। খুব ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘কষ্ট দিলাম…’

মাওলানা মাথা নাড়লেন।

‘চলুন, কথা পরে হবে।’

সাবধানে তাঁকে মুর্দা খাটিয়ায় তোলা হলো।

সরস্বতী দেবীর ভেজা পা দুটো কাদায় মাখামাখি হয়ে ছিল। ছোট্ট সাদিক নিজের গামছা দিয়ে আস্তে আস্তে কাদা মুছে দিল। বৃদ্ধা দুর্বল চোখে তার দিকে তাকিয়ে শুধু একবার হাসার চেষ্টা করলেন।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তুলসীগাছটার নিচে বৃষ্টির পানি জমে ছোট্ট আয়নার মতো হয়ে আছে।

রাস্তা বলতে যা, বর্ষায় তা আর রাস্তা থাকে না। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও ভাঙা সাঁকো। একজন পিছলে গেলে বাকিরাও থেমে যায়। আবার উঠে দাঁড়ায়।

ছাত্ররা পালা করে খাটিয়া ধরছে।

কেউ বলছে, ‘আমি একটু নিই।’

কেউ বলছে, ‘আপনি বিশ্রাম নিন।’

মাওলানা মাঝেমধ্যে বৃদ্ধার নাকের কাছে হাত নিয়ে শ্বাস দেখছেন।

হরিপদ হাঁটতে হাঁটতে শুধু বিড়বিড় করছেন।

‘আর একটু… আর একটু…’

হঠাৎ তিনি বললেন, ‘হুজুর…’

‘জি?’

‘আজ যদি আপনাদের না পেতাম…’

মাওলানা উত্তর দিলেন না।

কারণ এমন রাতের কথার উত্তর কথায় হয় না।

প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর ছোট্ট সাদিক হাঁপিয়ে গেল।

সে লজ্জা পেয়ে বলল, ‘হুজুর, একটু দম নিই?’

‘নাও।’

সবাই থামল।

চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।

দূরে বিদ্যুতের আলো একবার ঝলকে নিভে গেল।

হরিপদ চুপচাপ নিজের গামছা খুলে সাদিকের মুখ মুছে দিলেন।

‘বাবা, তুই না থাকলে আমি একা কী করতাম?’

সাদিক লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল।

‘আমি তো কিছুই করিনি।’

আবার পথ চলা শুরু হলো।

কিছুদূর যেতেই সরস্বতী দেবীর বুকের ওঠানামা হঠাৎ খুব ধীর হয়ে এল। হরিপদ কাঁপা হাতে স্ত্রীর কপালে হাত রাখলেন। তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল।

‘হুজুর…!’

মাওলানা দ্রুত নাকের কাছে হাত নিয়ে শ্বাস দেখলেন।

‘আছে। দ্রুত চলুন।’

ছাত্ররা আর কিছু না বলে খাটিয়া কাঁধে নিয়ে প্রায় দৌড়াতে শুরু করল।

মাওলানার মনে পড়ছিল বহু বছর আগের কথা।

তিনি তখন ছোট।

তার বাবা ছিলেন দিনমজুর।

একবার তাঁর মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেদিনও গভীর রাত ছিল। পাশের গ্রামের এক বৃদ্ধ শিক্ষক নিজের গরুর গাড়ি নিয়ে এসে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

লোকটা ছিলেন হিন্দু।

বাবা ফিরে এসে শুধু বলেছিলেন, ‘মানুষের ঋণ ধর্ম দিয়ে মাপা যায় না।’

সেই কথাটা আজও তাঁর ভেতরে কোথাও রয়ে গেছে।

হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ভোর।

জরুরি বিভাগের সামনে তখন কেবল দু-একজন রোগী।

ডিউটির নার্স দ্রুত ভেতরে নিয়ে গেলেন।

ডাক্তার এসে পরীক্ষা করলেন।

অক্সিজেন লাগল।

স্যালাইন লাগল।

তারপর সবাইকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলা হলো।

হরিপদ বেঞ্চে বসে আছেন।

তার দুহাত কাঁপছে।

তিনি বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছেন।

মাদ্রাসার ছাত্ররা ভেজা কাপড়ে বসে আছে। কারও চোখে ঘুম নেমে এসেছে। তবু কেউ ফিরতে চায় না।

মাওলানা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।

হাসপাতালের মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে আসল। নামাজ পড়তে ছাত্রদের নিয়ে মসজিদে গেলেন মাওলানা।

ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে হাসপাতালের দেয়ালে পড়ছে।

অনেকক্ষণ পরে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। এরইমধ্যে নামাজ শেষে ছাত্রদের নিয়ে মাওলানা হাসপাতালের বারান্দায় চলে এসেছেন।

ডাক্তার বললেন, ‘ঠিক সময়ে নিয়ে এসেছেন। আর আধঘণ্টা দেরি হলে বাঁচানো কঠিন হতো। এখন আপাতত বিপদ কেটে গেছে।’

হরিপদ যেন কথাটার অর্থ বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন।

তারপর তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

মাওলানার সামনে এসে হাত জোড় করলেন।

‘না, না… এটা করবেন না।’

কিন্তু বৃদ্ধ থামলেন না।

চোখ ভরে গেল পানিতে।

‘আপনি তো… আমাদের ধর্মের মানুষ নন।’

কথাটা বলতে গিয়ে যেন তাঁর নিজেরই সংকোচ লাগছিল।

মাওলানা কিছুক্ষণ বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘অসুস্থ মানুষের ধর্ম আগে দেখি না। মানুষ দেখি।’

বৃদ্ধ মাথা নিচু করে কাঁদছিলেন।

কোনো শব্দ ছাড়া।

সেই কান্না হাসপাতালের সাদা দেয়ালে লেগে আরও নীরব হয়ে যাচ্ছিল।

ফিরে আসার পথে সূর্য উঠেছে। ভেজা ধানের পাতায় আলো ঝিলমিল করছে।

গ্রামের মানুষ তখন ঘুম থেকে উঠছে।

কেউ জানে না, এই রাতটা কেমন কেটেছে।

মাদ্রাসায় ফিরে ছাত্ররা মুর্দা খাটিয়াটি বারান্দায় ঝুলিয়ে দিল। তারপর ভেজা কাপড় পাল্টে যে যার বিছানা গুছিয়ে পড়তে বসা শুরু করল।

মাওলানা এগিয়ে গিয়ে বললেন, আজ একটু ঘুমিয়ে নাও। ছাত্ররা আবার বিছানা পেতে শরীর এলিয়ে দেয়।

কিন্তু মাওলানা ঘুমোতে পারলেন না।

জানালার পাশে বসে বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো দেখছিলেন।

মনে হচ্ছিল, মানুষের জীবনও বোধহয় এই বৃষ্টির মতোই। কার ছাদের ওপর পড়বে, কার উঠোন ভিজিয়ে যাবে, আগে থেকে বলা যায় না।

এরপর কয়েক দিন কেটে গেল।

সরস্বতী দেবী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

এক বিকেলে তিনি আর হরিপদ মাদ্রাসায় এলেন।

হাতে একটা ছোট ঝুড়ি।

নিজেদের গাছের পেয়ারা, কয়েকটা নারকেল আর বাড়িতে বানানো মুড়ি।

মাওলানা বললেন, ‘এসব কেন?’

হরিপদ মৃদু হেসে বললেন, ‘ঋণ শোধ করতে না পারি, মনে রাখার একটা অজুহাত তো থাক।’

মাওলানা ঝুড়িটা নিলেন না।

বললেন, ‘ছাত্রদের দিয়ে দিন। ওরা খুশি হবে।’

সরস্বতী দেবী ধীরে ধীরে ছাত্রদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

বললেন, ‘তোরা সবাই ভালো মানুষ হবি।’

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সেই রাতের ঘটনার খবর কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল।

কে যেন বলেছিল, ‘মাদ্রাসার মুর্দা খাটিয়ায় একজন হিন্দু মহিলাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’

খবরের সঙ্গে কথা বাড়তেও সময় লাগেনি।

কেউ বলল, মানুষ বাঁচানোই বড় কথা।

কেউ বলল, মাদ্রাসার জিনিসেরও তো একটা মর্যাদা আছে।

দু-এক দিন পর বিকেলে চায়ের দোকানে বিষয়টা নিয়ে আবার আলোচনা উঠল।

সাবেক মেম্বার আখলাস মিয়া চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, ‘মানুষকে সাহায্য করায় আমার আপত্তি নেই। কিন্তু মাদ্রাসার মুদ্দা খাটিয়ায় অন্য ধর্মের মানুষকে তোলা কি ঠিক হয়েছে?’

দোকানে বসা কয়েকজন মাথা নাড়ল।

একজন বলল, ‘কথাটা কিন্তু ভেবে দেখার মতো।’

আখলাস মিয়া বললেন, ‘মাওলানা সাহেবকে ডেকে কথা বলা দরকার।’

খবরটা সন্ধ্যার আগেই মাওলানার কানে পৌঁছে গেল।

তিনি শুধু বললেন, ‘যদি কথা বলতে চান, আমি আসব।’

পরদিন আসরের নামাজের পর ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষ বসলেন। চেয়ারম্যানও এলেন। কোনো উত্তেজনা নেই। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

চেয়ারম্যান শান্ত গলায় বললেন, ‘মাওলানা সাহেব, আপনি যা করেছেন, কেন করেছেন, সবার সামনে বলুন।’

মাওলানা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন, ‘সেদিন রাত আড়াইটায় একজন মানুষ আমার দরজায় এসে বললেন, তাঁর স্ত্রী মারা যেতে পারেন। আমি তখন কী করতাম? আগে জিজ্ঞেস করতাম, আপনার ধর্ম কী?’

কেউ কোনো কথা বলল না।

তিনি আবার বললেন, ‘সেদিন খাটিয়ায় আমি কোনো ধর্মকে বহন করিনি। বহন করেছি একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে।’

আখলাস মিয়া শান্ত স্বরেই বললেন, ‘কিন্তু ওটা তো মুদ্দা খাটিয়া।’

মাওলানা তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিকই বলেছেন। বলুন তো, মুর্দা খাটিয়া কেন বানানো হয়?’

কেউ উত্তর দিল না।

‘মানুষকে বহন করার জন্য। মৃত মানুষকে। আর সেদিন সেই খাটিয়ায় শোয়ানো মানুষটি তখনও বেঁচে ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে বাঁচার সুযোগ দিয়েছেন। আমরা শুধু সেই সুযোগটুকু নষ্ট হতে দিইনি।’

নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল।

মাওলানা এবার একটু নিচু গলায় বললেন, ‘একটা কথা বলুন। যদি সেদিন ওই মহিলা রাস্তায় মারা যেতেন, আর আমি খাটিয়া ঘরে তুলে রেখে দিতাম, তাহলে কি খাটিয়ার সম্মান থাকত, আর মানুষের সম্মান থাকত না?’

প্রশ্নটার উত্তর কারও কাছে ছিল না।

সবাই চুপ।

চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন।

তারপর বললেন, ‘আমরা কেউ নিজের ধর্ম ছেড়ে অন্য ধর্ম পালন করছি না। একজন অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এটাকে যদি দোষ বলি, তাহলে কাল আমাদের বাড়িতেও বিপদ এলে কেউ এগিয়ে আসবে না।’

আখলাস মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

‘আমি মানুষ বাঁচানোর বিরুদ্ধে কিছু বলিনি। ভুল বুঝেছি হয়তো।’

মাওলানা এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাত ধরলেন।

‘আমরা সবাই শিখছি, মেম্বার সাহেব। আমিও শিখছি।’

সেদিন আর কোনো সিদ্ধান্ত লিখে রাখতে হয়নি।

মানুষ নীরবে যার যার বাড়ি ফিরে গিয়েছিল।

বছর দুয়েক পরে শীতের এক সকালে খবর এল, হরিপদ পাল আর নেই।

বয়সের ভারে, দীর্ঘ অসুস্থতার পর তিনি চলে গেছেন।

মাওলানা বিকেলে নিঃশব্দে তাঁর বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

উঠোনে সেই পুরোনো তুলসীগাছ।

মাওলানার চোখ হঠাৎ উঠোনের এক কোণে গিয়ে থামল। বাঁশের বেড়ার গায়ে একটি পুরোনো বাঁশের লাঠি ঠেস দিয়ে রাখা। তিনি চিনতে পারলেন। সেই বৃষ্টির রাতে কাদার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হরিপদ এই লাঠিতেই ভর দিয়েছিলেন।

মানুষ চলে যায়। কিছু জিনিস থেকে যায়। আর কিছু রাত কখনো পুরোনো হয় না।

পাশে একটি খালি মোড়া।

যেখানে হরিপদ প্রায়ই বসে রোদ পোহাতেন।

সরস্বতী দেবী দরজায় এসে তাঁকে দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, ‘ও শেষ দিকে প্রায়ই সেই রাতটার কথা বলত। বলত, মানুষের ঘর চিনতে ধর্ম লাগে না, দরজা লাগে।’

মাওলানা কোনো কথা বললেন না।

তিনি শুধু উঠোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেই কাদামাখা রাত নেই।

শুধু মনে হলো, মানুষের জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ হয়তো সেই পথ, যেখানে কেউ নিজের মানুষ না হয়েও কারও পাশে হাঁটে।

ফিরে আসার সময় আকাশে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল। পাশের মন্দিরে তখন ঘণ্টা বাজল।

মাওলানা থামলেন না। একই গ্রামের দুই শব্দ পেছনে রেখে তিনি ধীরে ধীরে মাদ্রাসার পথে হাঁটতে লাগলেন।