মানবাধিকার বাস্তবায়নে পাকিস্তানকে অগ্রগতি দেখাতে হবে-
পাকিস্তানের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জিএসপি+ বাণিজ্য সুবিধা ২০২৭ সালে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বর্তমান সুবিধাভোগী দেশগুলোর জন্য ২০২৮ সালে নতুন ব্যবস্থায় আবেদন করার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সুযোগ থাকবে এবং জিএসপি সুবিধা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে ২০২৯ সালের প্রথমার্ধে।
তবে পাকিস্তান নতুন করে জিএসপি সুবিধা পাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এর জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কনভেনশনগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখাতে হবে পাকিস্তানকে। বিশেষ করে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের।
ভয়েজপিক কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন পাকিস্তানে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রাইমুন্ডাস কারোবলিস। তিনি বলেন, জিএসপি পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ খুবই সীমিত। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন এবং কনভেনশন বাস্তবায়নের বাস্তব অগ্রগতিই হবে মূল বিবেচ্য।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুনিজা জাহাঙ্গীর।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাকিস্তানের জিএসপি স্ট্যাটাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জিএসপি পাকিস্তানকে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে টেক্সটাইল শিল্পের জন্য। পাকিস্তান কি ২০২৭ সালে আবার জিএসপি সুবিধা পাবে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: এখানে একটি বিষয় সংশোধন করা দরকার। সম্ভবত ২০২৭ নয়। যেসব দেশ ইতোমধ্যে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে, তাদের জন্য ২০২৮ সালে নতুন ব্যবস্থায় আবেদন করার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় থাকবে।
অর্থাৎ জিএসপি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে বাস্তব সিদ্ধান্ত হতে পারে ২০২৯ সালের প্রথমার্ধে। তাত্ত্বিকভাবে পাকিস্তানের হাতে এখনও সময় আছে।
তবে পাকিস্তান জিএসপি পাবে কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো, আমি জানি না। এটি নিশ্চিত নয়, ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই।
এটি নির্ভর করবে জাতিসংঘের কনভেনশনগুলো পাকিস্তান কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে তার ওপর। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জিএসপি+ ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত হলো, এসব কনভেনশন বাস্তবায়নে কোনো গুরুতর ব্যর্থতা থাকা যাবে না।
এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত ও মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তান সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। আমি আশা করি, সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এবং সর্বশেষ জিএসপি+ প্রতিবেদনে যেসব নির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো সমাধানে কাজ করবে।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: বর্তমানে ২৭টি কনভেনশন রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে ৩২টি হবে। কোন বিষয়গুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: বর্তমানে ২৭টি এবং নতুন ব্যবস্থায় ৩২টি কনভেনশন থাকবে। সবগুলোই পাকিস্তান অনুমোদন করেছে। অর্থাৎ আইনি দিক থেকে প্রথম শর্ত পূরণ হয়েছে।
এখন গুরুত্ব দেওয়া হবে বাস্তবায়নের ওপর। সরকারকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, সময়সীমা এবং কর্মদক্ষতার সূচকসহ একটি অ্যাকশন প্ল্যান দিতে হবে।
তবে শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকালেই হবে না। পাকিস্তানের বর্তমান রেকর্ডও বিবেচনায় আসবে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের কিছু অর্জনের কথাও বলা হয়েছে। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে ২০১৪ সাল থেকে অগ্রগতি হয়েছে এবং গত দুই বছরেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের পরিধি কমানো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে কার্যত একটি স্থগিতাবস্থা, নির্যাতনবিরোধী আইন বাস্তবায়ন, বাল্যবিবাহবিরোধী আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় রয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে পশ্চাদপসরণও হয়েছে।
প্রধান উদ্বেগের জায়গাগুলো হলো জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এবং আমাদের নিজস্ব আলোচনার ভিত্তিতে কিছু কনভেনশনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
জিএসপি+ পুনরায় পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল চাইলে এসব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি প্রয়োজন।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধান সমস্যা হলো বাস্তবায়নের ঘাটতি। জাতীয় অ্যাকশন প্ল্যান তৈরিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি পাকিস্তানকে সহায়তা করছে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাকিস্তানের কাছে নিখুঁত বাস্তবায়ন দাবি করছে না।
প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়টিও আমরা স্বীকার করি। আমরা ইউরোপীয় পর্যায়ের মানদণ্ড দাবি করছি না। কেউই নিখুঁত নয়।
তবে আমরা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বাস্তবায়ন আশা করি।
এতদিন পরিস্থিতি অনেকটা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, আবার কিছু সমস্যার সমাধান হয়নি বা সীমিত অগ্রগতি হয়েছে। এখনকার প্রতিবেদনে কয়েকটি ক্ষেত্রে এমন উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, যেখানে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি ‘রেড জোনে’ চলে যাচ্ছে।
তাই এসব ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: পাকিস্তান যদি শর্ত পূরণ করতে না পারে, তাহলে কি ভারতের মতো জিএসপি+ থেকে সাধারণ জিএসপিতে নামিয়ে দেওয়া হবে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: পাকিস্তান যদি জিএসপি+ এর জন্য পুনরায় আবেদন না করে, অথবা কোনো কারণে জিএসপি+ দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সাধারণ জিএসপি সুবিধা প্রযোজ্য হবে।
তবে সাধারণ জিএসপিতে শূন্য শুল্ক থাকবে না। শুল্ক বেশি হবে। তারপরও চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের তুলনায় তা প্রায় ৩০ শতাংশ কম হতে পারে।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: জোরপূর্বক গুম ও নির্বিচারে আটকের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে উত্থাপন করছে। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তাদের প্রতিক্রিয়া কী?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।
সরকারের একটি যুক্তি হলো, পাকিস্তান একটি বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এটি সত্য। পাকিস্তান গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
কিন্তু আমাদের অবস্থান হলো, নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেমনই হোক, মানবাধিকারবিষয়ক কনভেনশন ও মৌলিক অধিকার কার্যকর থাকতে হবে।
আমরা বলছি না যে সরকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে না। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকারসহ মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষিত রাখতে হবে।
একই সঙ্গে যারা অপরাধ করেছে, তাদের দায়ী করতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। জোরপূর্বক গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয় যে তারা নিরাপত্তাজনিত অবস্থানের মধ্যেও এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি করতে চায় কি না।
আমরা মনে করি, এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেখানে অগ্রগতি অবশ্যই প্রয়োজন।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: ব্লাসফেমি মামলা নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ রয়েছে। ২০২১ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট পাকিস্তানের জিএসপি+ স্ট্যাটাস পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিল। সেখানে ব্লাসফেমি মামলা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়গুলো উঠে এসেছিল। পরিস্থিতির কি কোনো উন্নতি হয়েছে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: ব্লাসফেমি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশেষ করে সাংবাদিকদের অধিকার, দুটি আলাদা বিষয়।
ব্লাসফেমির ক্ষেত্রে কয়েক বছর আগে যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মামলা দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমানোর জন্য সরকারের প্রচেষ্টাকে আমরা স্বাগত জানাই।
ইসলামাবাদ ও সিন্ধুতে ১০০ জনের বেশি মানুষকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তও আমরা স্বাগত জানিয়েছি। কিন্তু পাঞ্জাবে এখনো একই ধরনের পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সেখানে প্রায় ৫০০ মানুষ, যাদের মধ্যে তরুণও রয়েছে, এখনো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছে।
সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যায় যে ব্লাসফেমি আইন অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। তাই এই দিকটি মোকাবিলা করা জরুরি।
একই সঙ্গে ব্লাসফেমি আইন যাতে অপব্যবহার না হয় এবং এ ধরনের উসকানি যাতে কার্যকর না হয়, তার জন্য অতিরিক্ত নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অধিকারও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
পেকা (PECA) আইনের সাম্প্রতিক সংশোধন এবং এর প্রয়োগের ধরন, পাঞ্জাবের মানহানি আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের কিছু দিক নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে।
এসব বিষয় মোকাবিলা করা প্রয়োজন, যাতে সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: প্রতিবেদনে বিরোধী নেতাদের আটক, ন্যায়বিচারের মানদণ্ড এবং কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের আইনজীবী, দর্শনার্থী ও চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাকিস্তান কি এ ক্ষেত্রে কোনো উন্নতি করেছে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: রাজনৈতিক বহুত্ববাদ আমাদের মানবাধিকার সংলাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকার নিয়ে যে আলোচনাগুলো হয়, সেখানেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।
কারাগারে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে আমরা মূলত কারাগারের পরিবেশ, নির্যাতন হচ্ছে কি না, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং এ ধরনের বিষয়গুলো দেখি।
আমরা কোনো নির্দিষ্ট মামলায় হস্তক্ষেপ করি না। কোনো ব্যক্তি দোষী না নির্দোষ, সেই সিদ্ধান্ত আদালতের।
আমি আশা করি, আদালত যথাযথ ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেবে।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: সামরিক আদালতে বেসামরিক নাগরিকদের বিচার নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে আইসিসিপিআরের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে যে সুষ্ঠু বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, তার সঙ্গে সামরিক বিচারব্যবস্থার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আপনাদের উদ্বেগ কী?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: আমরা পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে স্বীকার করি। কিন্তু সামরিক আদালতের পরিধি যখন বাড়ানো হয় এবং বেসামরিক নাগরিকদেরও এর আওতায় আনা হয়, তখন তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো আনুপাতিকতা।
আমরা নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বুঝি। কিন্তু একই সঙ্গে মানবাধিকারও কার্যকর থাকতে হবে।
বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা মূল্যায়ন করবেন, এই পদক্ষেপ আনুপাতিক কি না এবং এর কোনো দিক সংশ্লিষ্ট কনভেনশনের লঙ্ঘন করছে কি না।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: সামরিক আদালতের বিষয়টি কি জিএসপি+ প্রতিবেদনের একটি রেড ফ্ল্যাগ?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: এটি জিএসপি+ প্রতিবেদনে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। তবে এটি কোন নির্দিষ্ট শ্রেণিতে পড়বে, তা এখনই বলা আমার পক্ষে কঠিন।
এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ এখনও আমাদের হাতে নেই। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের আরও বিশদ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আমরা যে প্রধান রেড ফ্ল্যাগগুলো এখন দেখছি, সেগুলো হলো জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো নিয়ে আপনাদের উদ্বেগ কী?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: এ ক্ষেত্রেও আমরা প্রথমত জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণের দিকে তাকাচ্ছি।
সাংবিধানিক সংশোধনীগুলোর পরপরই জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। আন্তর্জাতিক সিভিল সোসাইটি সংগঠন এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোও উদ্বেগ জানিয়েছে।
এখানে মূল বিষয় হলো বিচারব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট প্রতিষ্ঠা।
নিজে থেকে এটি হয়তো সমস্যা নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট আদালতে বিচারকদের নিয়োগের পদ্ধতি, বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে তাদের নিয়োগের বিষয়টি সম্ভাব্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
মূল উদ্বেগ হচ্ছে পরিবর্তনের গতিপথ নিয়ে। ভবিষ্যতে এই সংশোধনীগুলোর কী পরিণতি হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: সংঘাতপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ রয়েছে। আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ভবিষ্যতের মূল্যায়নে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: বর্তমান প্রতিবেদনের রেফারেন্স সময়কাল গত বছরের শেষ পর্যন্ত হওয়ায় আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের এই নির্দিষ্ট ঘটনাটি এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
তবে বিষয়টির আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে সংঘাতের পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সীমিত করা যেতে পারে। কিন্তু সেটি অবশ্যই আনুপাতিক হতে হবে।
আমি নিশ্চিত নই যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সত্যিই আনুপাতিক কি না, বিশেষ করে যদি এটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বা সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত না হয়।
তবে এটি আমার ব্যক্তিগত সংশয়। সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের মানদণ্ডের আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করা উচিত।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: পাকিস্তানে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ রয়েছে। সরকার কি তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়ে আপনাদের কোনো আশ্বাস দিয়েছে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: আহমদিয়া সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি অবশ্যই বড় উদ্বেগের বিষয়।
আহমদিরাও পাকিস্তানের নাগরিক এবং তাদের অধিকার সম্মান করতে হবে।
এটি শুধু সাংবিধানিক বিধানের বিষয় নয়। মানুষের মর্যাদা, শারীরিক নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারও এর সঙ্গে যুক্ত।
আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর যে সহিংসতা ও নির্যাতন মাঝেমধ্যে ঘটে, তা বন্ধ হওয়া উচিত এবং সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিয়ের নিবন্ধন ও নথিপত্রের মতো কিছু বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। এসব বিষয় ধর্মীয় বিবেচনার পরিবর্তে নাগরিক ও প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে মোকাবিলা করা উচিত।
সরকারের সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করছি। সাধারণভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান দেখা যায়নি।
আমরা আশা করি, বিষয়টি দ্রুত ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করা হবে। অন্তত জিএসপি+ পুনরায় আবেদনের সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: আপনি সংখ্যালঘুদের অধিকারকে রেড ফ্ল্যাগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেদনে আফগান শরণার্থীদের অধিকার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে আফগান শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। এখন অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান কঠোর হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান কী?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসন, মানবাধিকার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলো বাস্তবায়ন করে।
যারা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য এবং প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করে, তারা সেই সুরক্ষা পায়।
আমি লিথুয়ানিয়া থেকে এসেছি। আমরা এক দশকেরও বেশি সময় আফগানিস্তানে ছিলাম। তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে শেষ কয়েক ঘণ্টাতেও যারা লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাদের আমরা বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। তারা এখন লিথুয়ানিয়ায় বসবাস করছেন এবং সমাজের সঙ্গে একীভূত হচ্ছেন।
অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে আফগান নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠেছে এবং তাদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত রয়েছে।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন।
আফগান শরণার্থীরা পাকিস্তানে প্রায় ৪০ বছর ধরে বসবাস করছে এবং সমাজের সঙ্গে অনেকটাই একীভূত হয়েছে। আমার মনে হয় না তারা পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি বোঝা তৈরি করেছে। বরং তারা অর্থনীতিতেও অবদান রেখেছে।
তবে পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে।
আমাদের প্রধান উদ্বেগ হলো, যারা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার যোগ্য, যাদের জন্য আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়া বিপজ্জনক এবং যারা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাদের বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে।
এ ধরনের মানুষকে জোর করে ফেরত পাঠানো উচিত নয়।
অন্যদের ক্ষেত্রে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে এবং তাদের সম্পত্তি ও অন্যান্য অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
পাকিস্তান শরণার্থীসংক্রান্ত সব কনভেনশন অনুমোদন না করলেও ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বা কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত না পাঠানোর নীতি, যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, পাকিস্তানের জন্যও প্রযোজ্য।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: পাকিস্তানের মানুষ প্রায়ই প্রশ্ন করে, ব্রাসেলস কেন পাকিস্তান তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করছে, সে বিষয়ে এতটা উদ্বিগ্ন? জিএসপি+ তো মূলত বাণিজ্য সুবিধা। এর সঙ্গে মানবাধিকারকে যুক্ত করা হয়েছে কেন?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: প্রথমত, আমরা ইউরোপীয় মানদণ্ড চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলছি না। আমরা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কনভেনশনগুলোর কথা বলছি।
পাকিস্তান এসব কনভেনশন নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে মোটামুটি ভালো রেকর্ডের অধিকারী। দ্বিতীয়ত, আমাদের দৃষ্টিতে মানবাধিকার একটি সমাজের উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি।
মানুষ স্বাধীন না হলে এবং মৌলিক মানবাধিকার ভোগ না করলে অর্থনীতি ও সমাজ সমৃদ্ধ হতে পারে না।
ইউরোপের অভিজ্ঞতাও সেটিই দেখিয়েছে।
পাকিস্তান নিজেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য। তাই প্রশ্নটি মূলত বাস্তবায়নের।
একটি সমাজ তখনই সমৃদ্ধ হতে পারে, যখন তার মানুষ স্বাধীন এবং মৌলিক অধিকার ভোগ করে।
মুনিজা জাহাঙ্গীর: পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং গাজা ইস্যুতেও একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এ কারণে কি পাকিস্তান জিএসপি+ এর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় পেতে পারে? মানবাধিকার বিষয়টি কি কিছুটা উপেক্ষা করা হবে?
রাইমুন্ডাস কারোবলিস: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের নেতৃত্বকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। গাজা সংঘাতেও পাকিস্তানের ইতিবাচক ভূমিকা আমরা স্বাগত জানাই।
এটি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাত সমাধানে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব হলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারে এবং ব্যবসাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু জিএসপি+ এর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।
এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে সিদ্ধান্তগুলো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের ভিত্তিতে নিতে হবে।
শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট কনভেনশনগুলোর বাস্তবায়নে গুরুতর ব্যর্থতা থাকা যাবে না।
প্রথমত জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো বিষয়টি মূল্যায়ন করবে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন পাওয়ার পরই বিষয়টি রাজনীতিবিদ, সদস্য রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কাছে যাবে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রক্রিয়াটিকে পরিবর্তন করার সুযোগ খুবই সীমিত।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বা সদস্য রাষ্ট্রগুলো অবশ্য প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন যথেষ্ট বস্তুনিষ্ঠ কি না এবং জিএসপি+ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বাস্তবায়ন হয়েছে কি না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাটি যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেভাবেই চলতে হবে।
তাই আমাদের দৃষ্টিতে একমাত্র পথ হলো, সরকারকে জাতিসংঘের সব কনভেনশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন।