Skip to main content

Brick Lane News

বাংলাদেশে ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য; হিন্দুস্থান টাইমসকে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য; হিন্দুস্থান টাইমসকে শেখ হাসিনা

একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—মন্তব্য করেছেন শেখ হাসিনা।

মুল প্রতিবেদন: রেজাউল এইচ লস্কর, অনুবাদ- ব্রিকলেন নিউজ 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রথম টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যর্পণকে (extradition) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপি সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই তিনি নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

হিন্দুস্তান টাইমস-এর (এইচটি) সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বিএনপি সরকারের ২.৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, সারের অভাব এবং অসহনীয় মূল্যস্ফীতির মুখে দাঁড়িয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই বিলাসিতা কেন?

টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ:

প্রশ্ন: আপনার প্রত্যর্পণকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া এবং ভারতে আপনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সে বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

শেখ হাসিনা: আমি একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছি। এটি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে সমস্যা হতে পারে? তারেক রহমান ২০০৭ সালে যখন দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে যান, তখন রাজনীতি করবেন না মর্মে একটি স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে মুচলেকা দিয়েছিলেন। অথচ তিনি লন্ডনে বসে রাজনীতি করলেন, নিজের মা খালেদা জিয়ার জায়গায় দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করলেন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও প্রকাশ্য সভাগুলোতে অংশ নিলেন। আমি কি কখনো ব্রিটিশ সরকারকে বলেছিলাম যে আমার দেশের একজন পলাতক আসামিকে এমন সভা করা থেকে বিরত রাখা হোক? আমি তো এমন অভিযোগ কখনো তুলিনি। তাহলে এখন তাঁর সমস্যা কোথায়?

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের যেভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে, তাদের বাড়িতে যেভাবে হামলা চালানো হচ্ছে—এর সূচনা করেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস (অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান) এবং এখন তা অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। এমন কোনো দিন নেই যেদিন মানুষ খুন হচ্ছে না। রংপুরের ঘটনাটি দেখুন, যেখানে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হলো; কিংবা বগুড়া শহরে যেভাবে যুবলীগের এক কর্মীকে হত্যা করা হলো। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা তারা আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করছে, গ্রেপ্তার করছে কিংবা মামলা দিচ্ছে। ঘরে ঢুকে পুরুষ ও নারীদের নির্যাতন করছে, বৃদ্ধদেরও মারধর ও হেনস্তা করছে।

এই বাস্তবতায় আমার প্রত্যর্পণ কীভাবে দ্বিপাক্ষিক সফরের শর্ত হতে পারে, তা আমার মাথায় আসছে না। আমি তো আমার নিজের দেশেই ফিরে যাচ্ছি; তিনি [তারেক রহমান] কেন এতে বাধা দিচ্ছেন তা বুঝতে পারছি না। তারা প্রত্যর্পণ চুক্তির কথা বলছে, অথচ আমি নিজেই আমার দেশে ফিরতে চাই। আমি ফিরে যাবই। আমি কি সারা জীবন বিদেশে কাটিয়ে দেব? আমাকে আমার দেশে, আমার নিজের মানুষের কাছেই ফিরতে হবে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো সত্য কথা বললে নষ্ট হয় না। সম্পর্ক তখনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যখন গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়, চরমপন্থাকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়, সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো হয়। একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, ভারতের নিরাপত্তা ও দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার স্বার্থেও জরুরি। প্রত্যর্পণের ইস্যুটিকে এখানে স্রেফ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।

প্রশ্ন: দেশে ফেরার জন্য আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন? ভারতে নির্বাসিত অন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ফিরবেন কি? এছাড়া আপনার সংবাদ সম্মেলনে কেন বলেছিলেন যে দেশে ফিরলে আপনাকে গ্রেপ্তার বা হত্যা করা হতে পারে?

শেখ হাসিনা: আমি বলেছি যে ডিসেম্বরের মধ্যেই আমার দেশে ফেরার ইচ্ছা আছে, কারণ বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক সংকটকে অনির্দিষ্টকাল চলতে দেওয়া যায় না। উপযুক্ত সময়ে আমি ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং প্রবেশের স্থান জানিয়ে দেব।

আমি ফিরতে চাই কারণ বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পথ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের সরকারের আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বেড়ে ২,৭৮৪ ডলারে পৌঁছেছিল। সেই সমস্ত অর্জনকে আজ ধ্বংস করা হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি আওয়ামী লীগ আমলের ৬.৮০ শতাংশ থেকে নেমে ২.২২ শতাংশে ঠেকেছে। ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দারিদ্র্য মারাত্মকভাবে বেড়েছে, বিনিয়োগ ঋণাত্মক ধারায় নেমে গেছে। নতুন করে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বেকার হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট ফিরে এসেছে।

এটি শুধু আওয়ামী লীগের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। উন্নয়ন থেমে গেলে কর্মসংস্থান বিলীন হয়ে যায়; আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে মানুষের নিরাপত্তা হারিয়ে যায়; আর উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠলে বাংলাদেশ পুরো অঞ্চলের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা দেশের বাইরে আছেন, আবার অনেকে দেশের ভেতরেই আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কে কখন ফিরবেন, তা দলের সঙ্গে আলোচনা করে এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঠিক করা হবে। আমি চাই না আমাদের কোনো নেতাকর্মী বা সমর্থক অপ্রয়োজনীয় বিপদের মুখে পড়ুক।

আমার নিজের বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। আমার জীবনের ওপর হুমকি নতুন কিছু নয়। ১৯৭৫ সালে আমি আমার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। দেশে ফেরার পর সামরিক শাসন, স্বৈরতন্ত্র, ষড়যন্ত্র এবং বারবার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঢাকার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল; ২৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। আমি বেঁচে গেলেও আমার বহু সহকর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই হামলা সেদিনও আমাকে থামাতে পারেনি, আর কোনো হুমকি দিয়ে আজও আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করা যাবে না। আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি না। আমার এই ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

প্রশ্ন: দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আপনি কি প্রস্তুতি শুরু করেছেন?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যা ১৯৪৯ সালে গঠিত হয়েছিল এবং সৃষ্টির পর থেকেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছে। আমার পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ দলটিকে নিয়েই দেশকে স্বাধীন করেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে—দরিদ্র মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত। আমরা বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলাম। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে অবস্থান গড়ে নিয়েছিল এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই ছিল আমাদের অবস্থান। আজ তারা সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষের বুক চিরে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান; যারা অসাংবিধানিক বা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, তাদের মতো দল নয় এটি। সামরিক একনায়করা বাংলাদেশে বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেছে, রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। মুহাম্মদ ইউনূসও একইভাবে একটি অসাংবিধানিক সরকার গঠন করেছিলেন এবং দল তৈরি করেছিলেন।

তারা আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করল? আওয়ামী লীগ যদি খারাপ কিছু করে থাকে, তবে জনগণকেই সেটির বিচার করতে দিন। আমরা ভালো নাকি মন্দ, নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা জনগণের কাছে যাব এবং তারাই রায় দেবে। আমরা ভুল করলে জনগণ আমাদের প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু ক্ষমতা দখলকারীদের আমাদের দলকে নিষিদ্ধ করার কী অধিকার আছে?

আমি নিয়মিত আমাদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি—যদিও তাদের এক কোটি মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত এবং দুই কোটি নেতাকর্মী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর এত নির্যাতনের পরও সাধারণ মানুষের কাছে যদি কোনো দল এখনো জনপ্রিয় থাকে, তবে সেটি আওয়ামী লীগ; মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস এখনো আওয়ামী লীগের ওপরই রয়েছে।

তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী আজ আদালতের চক্করে ঘুরছেন, তাদের বিরুদ্ধে ৬ লাখ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে কি কারও কথা বলা উচিত নয়? অথচ ২০২৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের পর যারা সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত ছিল, যারা পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করেছে এবং দিপু দাসের মতো সাধারণ মানুষদের হত্যা করেছে—তাদের ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হবে না। আজ বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীরা সম্পূর্ণ মুক্তভাবে বিচরণ করছে।

প্রশ্ন: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভারত সরকার কিংবা ঢাকার বর্তমান সরকারের সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা আলোচনা করেছেন কি না?

শেখ হাসিনা: দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একান্তই আমার নিজের এবং এটি আমার দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। ঢাকা সরকারের সঙ্গে আমার কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা আঁতাত নেই। যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতার প্রশ্নই ওঠে না।

প্রশ্ন: বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিরোধী জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির চাপের কারণেই বিএনপি সরকার আপনার প্রত্যর্পণের জন্য জোর দিচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

শেখ হাসিনা: এ প্রশ্নটি আমার বদলে আপনাদের বিএনপিকে কিংবা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে করা উচিত। আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, জামায়াত ও বিএনপি সবসময় একসঙ্গেই ছিল, অতীতেও তারা একসঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচন করেছে। বাস্তবে তাদের মধ্যে মৌলিক কোনো তফাত নেই। দ্বিতীয়ত, মুহাম্মদ ইউনূসও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন; ফলে এই তিন পক্ষই আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

তাদের ভেতরে কী খেলা চলছে তা আমার জানা নেই, তবে আমরা সবসময় মনে করি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা আবশ্যক। আমি যখন ক্ষমতায় ছিলাম, আমার পিতা বঙ্গবন্ধুর দেওয়া পররাষ্ট্রনীতি—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—আমরা সেটাই অনুসরণ করেছি। আমাদের আমলে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের চমৎকার সম্পর্ক ছিল। আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল দেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, তরুণদের জন্য আধুনিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও প্রযুক্তির কর্মসংস্থান তৈরি করা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। আমি জানতাম, বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব না দিলে কর্মসংস্থান হবে না। গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে শিল্পায়ন সম্ভব নয়। আমরা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমি আধুনিক শিল্পায়নের বিকাশ ঘটিয়েছিলাম।

আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, আমি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে হয়, কিন্তু বর্তমান সরকারের কাছে অর্থ নেই। মানুষ এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে দেশের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তারা সার সরবরাহ করতে পারছে না, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। আমাদের সময়ে সামাজিক নিরাপত্তার যে বিশাল জাল ছিল, তাদের তা নেই। তারা সময়মতো টিকা আমদানি করতে পারেনি, ফলে হামে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার শিশু মারা গেছে। তারা শিল্পকারখানায় চলতি মূলধন জোগান দিতে পারছে না। এমন শোচনীয় পরিস্থিতিতে ২.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যুদ্ধবিমান কেনার এই বিলাসিতা কেন? এটি আমারও বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নটি আপনাদের বিএনপি সরকারকে করা উচিত। আর তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে আমরা তো আগেই ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করে রেখেছিলাম। বর্তমান সরকার এখন কী করছে, সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।

প্রশ্ন: চরমপন্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকট নিয়ে আপনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাম্প্রতিক একটি সতর্কতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশ আরেকটি ‘পাকিস্তানে’ পরিণত হচ্ছে…

শেখ হাসিনা: এটি মূলত চরমপন্থা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেওয়ার এক বিপজ্জনক মেলবন্ধনকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশকে ঠিক সেই সর্বনাশা পথেই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, গোটা অঞ্চলের জন্যই চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং মেকানিজমও সম্প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা (AQIS) সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও একই বিপদের চিত্র উঠে আসছে। কেরানীগঞ্জ থেকে সাভার পর্যন্ত সাম্প্রতিক একের পর এক ঘটনার সংযোগসূত্র একই চরমপন্থী নেটওয়ার্কের দিকে ইঙ্গিত করে; যেখানে প্রেসার কুকার বোমা, পাইপ বোমা, গ্রেনেড, বিপুল বিস্ফোরক, অস্ত্র এবং নব্য জেএমবির (Neo-JMB) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

যখন আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা এবং দেশের ভেতরের তদন্ত একই বিপদের দিকে ইঙ্গিত করে, তখন কোনো দায়িত্বশীল সরকার সেই হুমকি অস্বীকার করতে পারে না। দেশজুড়ে ধর্মীয় মব ভায়োলেন্স বা উগ্র জনতার সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাজার, দরগাহ, ভাস্কর্য, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীকগুলোর ওপর নির্বিচারে হামলা চালানো হয়েছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) এবং অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (ATU)-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো ভেঙে দেওয়ার আলোচনা চলছে। একদিকে দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত কর্মকর্তাদের হয়রানি ও হেনস্তা করা হচ্ছে—যার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার এক ভয়াবহ শূন্যতা।

চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলো যদি বাংলাদেশে আবার নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে যায়, তবে এর সরাসরি আঘাত গিয়ে পড়বে ভারত, মিয়ানমার, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, আঞ্চলিক বাণিজ্য, অভিবাসন, সমুদ্রপথ, কূটনৈতিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার ওপর। কাজেই জয়ের এই সতর্কবার্তাকে নিছক কোনো রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে না দেখে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সতর্কতা (regional security alert) হিসেবে দেখা উচিত।