দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে বাংলাদেশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই ক্ষতবিক্ষত দেশকে মেরামতের জন্য বর্তমান সরকার ‘থ্রি আর’ কৌশলে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। এই কর্মযজ্ঞে নিজের উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায় বাংলাদেশ। একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া তারেক রহমান বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ।
ফ্যাসিবাদ থেকে উত্তরণ ও ‘থ্রি আর’ কৌশল
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। এসময় তিনি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট এবং টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এই ক্ষতবিক্ষত দেশ মেরামতের জন্য সরকার ‘রিকভারি’, ‘রেস্টোরেশন’ এবং ‘রিকনস্ট্রাকশন’—এই তিনটি সমন্বিত কৌশল অনুসরণ করছে।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও তরুণদের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তরুণ কর্মশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তিনি ঘোষণা দেন, তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুবিধার্থে চলতি অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, বরং অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে চায়, যাতে প্রতিটি নাগরিক ও পরিবারের কাছে সমৃদ্ধির সুফল পৌঁছায়। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা-বেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা
তারেক রহমান বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী, তাই আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে নারীরা সরকারের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছেন। নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প খাতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’-কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে, সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’— এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে।
জাতীয় সংস্কার ও টেকসই উন্নয়ন
- ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করছে।
- জাতিসংঘের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ৩১ দফা কর্মসূচির প্রায় ৭৩ শতাংশ কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত।
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
- কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সহযোগিতা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো-টেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তিনি সতর্ক করেন, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে রূপ না নেয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সবশেষে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।