টানা তিন বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আদায়ের মন্দা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশকে অবিলম্বে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বুধবার প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি আরও হ্রাস পেয়ে ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর যদি টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় এবং দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশের অর্থনীতি পুনরায় শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের দাম ও সরকারের জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে চলতি হিসাবের ভারসাম্য দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা সামলানোর নীতিনির্ধারণী সক্ষমতা ও রিজার্ভ বর্তমানে সীমিত।
দেশের প্রধান অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে বড় ধরনের সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫ শতাংশে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যার অর্থ নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর আগে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল, সেখানে সংঘাতের প্রভাবে চলতি বছর মাত্র ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্য কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার (NPL Ratio) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বৃদ্ধি পেয়ে ৩০.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মূলধন পর্যাপ্ততার হার সর্বনিম্ন সীমার নিচে চলে যাওয়ায় বেশ কিছু ব্যাংকের লোকসান শোষণের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এই সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায়ের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো জরুরি অগ্রাধিকার খাতগুলোতে সরকারের বিনিয়োগের সুযোগ চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জিন পেসমে বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল এর অর্থনৈতিক সহনশীলতা। তবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের উন্নয়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে সুনির্দিষ্ট ও সাহসী সংস্কার ছাড়া এই সহনশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব নয়। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসা এবং মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে অবিলম্বে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।