যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস) বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির প্রায় অর্ধেক হাসপাতালেই চিকিৎসকদের শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ও ফার্মাসিস্টদের দিয়ে।
এনএইচএসের নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন করে চলা এই পদ্ধতি নিয়ে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বিএমএ এবং নার্সিং সংগঠনগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় রোগী নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে বলে দাবি করছেন খোদ চিকিৎসকরাই।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যখাতে এক অদৃশ্য সংকট ডালপালা মেলছে। ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাম্প্রতিক এক জরিপ থেকে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা গেছে, দেশটির ৮৫টি হাসপাতাল ট্রাস্টের মধ্যে ৪১টিতেই (৪৮ শতাংশ) জুনিয়র ডাক্তার বা রেজিস্ট্রারের নির্ধারিত শিফটগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন ‘অ্যাডভান্সড প্র্যাকটিশনার’ (এপি)-রা। এই এপিদের মধ্যে রয়েছেন উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স, ফার্মাসিস্ট এবং প্যারামেডিকরা।
নীতিমালা বনাম বাস্তবতা: এনএইচএস ইংল্যান্ডের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, অ্যাডভান্সড প্র্যাকটিশনাররা কখনোই চিকিৎসকদের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হবেন না। কিন্তু বাস্তবে উত্তর কামব্রিয়া বা ল্যাঙ্কাশায়ারের মতো এলাকায় এপি-দের দিয়ে সিনিয়র রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। এমনকি রাদারহামের মতো স্থানে তাঁদের ‘নিরাপদ’ বিকল্প হিসেবে দাবি করা হলেও গত বছরের এক মর্মান্তিক ঘটনা আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সেখানে এক কনসালটেন্ট নার্সের ভুলের কারণে এন্ডোস্কোপি করতে গিয়ে ৭ জন রোগীর মৃত্যু হয়।
চিকিৎসকদের উদ্বেগ: জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫ হাজার চিকিৎসকের মধ্যে ৮০ শতাংশই মনে করেন, চিকিৎসকদের স্থলে এপি নিয়োগের ফলে রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে। ২৮ শতাংশ চিকিৎসকের মতে, এই ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বিপজ্জনক। বড় সমস্যা দেখা দিচ্ছে পদবি নিয়ে; ‘কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিশনার’-এর মতো নাম শুনে সাধারণ রোগীরা বুঝে উঠতে পারেন না যে তিনি ডাক্তার নাকি নার্স। বিএমএ-র চেয়ারম্যান টম ডলফিন একে একটি ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পাল্টা যুক্তি ও বিতর্ক: তবে রয়্যাল কলেজ অফ নার্সিং (আরসিএন) এই অভিযোগকে পেশাদারদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা বলে মনে করছে। তাদের মতে, অ্যাডভান্সড নার্সরা নিজ যোগ্যতায় দক্ষ এবং তাদের ছাড়া এনএইচএস অচল হয়ে পড়বে। যদিও কিছু গবেষণায় নার্সদের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় কোনো ঝুঁকির প্রমাণ মেলেনি বলে দাবি করা হয়েছে, তবে সেই প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে খোদ গবেষকদের মধ্যেই দ্বিধা আছে।
ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য বিভাগ এপি-দের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ বললেও স্বীকার করেছে যে তারা চিকিৎসকদের বিকল্প নন। বর্তমান চিকিৎসক সংকট কাটাতে হাসপাতালগুলো যে ‘শর্টকাট’ রাস্তা বেছে নিয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। স্বচ্ছ নীতিমালা এবং সঠিক তদারকি নিশ্চিত না করলে এই ‘ডাক্তারহীন’ চিকিৎসা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।