প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ, ঢাকা:
বাইসেপ দেখালেও গলল না রাজউক: কীবোর্ড বিপ্লবে বাঁচল না সোহেল তাজের প্লট
রাজনীতিতে টিকে থাকার কত কৌশলই না মানুষ আবিষ্কার করে! কেউ নতুন সমীকরণে নাম লেখান, কেউ নিরপেক্ষতার মুখোস পরেন, আর কেউ ডাম্বেল হাতে ফেসবুকে এসে নীতিবাক্য ঝাড়েন। আমাদের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ হয়তো ভেবেছিলেন, কীবোর্ড চাপড়ে আর হাওয়ার গতি বুঝে গুটি কয়েক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিলেই নতুন বন্দোবস্তে সব ‘সেট’ হয়ে যাবে। কিন্তু বিধি বাম! ডিজিটাল দুনিয়ার লাইক আর শেয়ার দিয়ে কি আর রাজউকের ফাইলের ধুলো ঢাকা যায়?
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সোহেল তাজের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। ফিটনেস টিপস আর জিম সেশনের ফাঁকে হঠাৎ করেই তাঁর মনে হয়েছিল দেশের রাজনীতি আর সুশাসন নিয়ে দু-কথা বলা দরকার। ফেসবুকে তিনি যেভাবে বার্তা দিচ্ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকজনকে তুষ্ট করতে তিনি বেশ ব্যাকুল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই অনলাইন ভোলবদলের সুবাদে হয়তো তিনি পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু আফসোস, রাজউকের কর্তারা বোধহয় নিয়মিত ফেসবুক স্ক্রল করেন না! তারা ভার্চুয়াল লাইক গোনার চেয়ে খাতার হিসাব মেলাতেই বেশি আগ্রহ দেখালেন।
উত্তরায় বিশেষ কোটায় পাওয়া পাঁচ কাঠার প্লটটির গল্পটাও কিন্তু বেশ আকর্ষণীয়। মাত্র ৩০ লাখ টাকায় সরকারি সুবিধা নিয়ে বরাদ্দ পাওয়া সেই জমি নাকি কিছুদিনের মধ্যেই কোটি কোটি টাকায় হাতবদল হয়ে গেল!
২০১১ সালের কথা। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তখন তিনি। রাজউকের উত্তরা তৃতীয় পর্বে বিশেষ কোটায় তার নামে বরাদ্দ হয় পাঁচ কাঠার একটি প্লট। দাম ধরা হয় মাত্র ৩০ লাখ টাকা! ভাবা যায়? আজকাল ঢাকার ভালো কোনো গলিতে এক টুকরো জমিও এই দামে মেলে না। কিন্তু ক্ষমতার ম্যাজিকে সবই সম্ভব। তবে এখানেই গল্পের শেষ নয়। ২০১৪ সালে সেই প্লট তিনি বিক্রি করে দেন তাসফিয়া ও লামিমা নামের দুই ব্যক্তির কাছে। রাজউকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, বিক্রির অঙ্কটা ছিল অন্তত ছয় থেকে সাত কোটি টাকা! মাত্র তিন বছরে ৩০ লাখ টাকার সম্পদ কীভাবে সাত কোটি হয়ে যায়, সেই জাদুর রহস্য হয়তো বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরাও বের করতে পারবেন না।
এমন মহাজাগতিক লাভের হিসাব দেখে পৃথিবীর বাঘা বাঘা অর্থনৈতিক গবেষকরাও হয়তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়বেন। সোহেল তাজ হয়তো হিসাব করেছিলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ‘ক্লিন ইমেজ’ হাজির করে এই অফলাইন আর্থিক জাদুকরী ঢাকা ফেলে দেওয়া যাবে। কিন্তু রাজউকের পর্যালোচনায় যখন পুরনো ফাইল খুলল, তখন দেখা গেল সাইবার জগতের মেকআপ দিয়ে বাস্তব জগতের নথিপত্র ঢেকে রাখা যায় না।
সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য তৈরি হলো ঠিক তখনই, যখন সাংবাদিকরা এই বিষয়ে কথা বলতে তাঁকে ফোন দিলেন। ফেসবুকে যিনি দীর্ঘ অনুচ্ছেদ লিখে জাতিকে নীতিশিক্ষা দেন, তিনি প্লটের কথা শুনতেই টুং করে ফোনটি কেটে দিলেন! এরপর বারবার রিং হলেও আর ফোন রিসিভ করার তোয়াক্কা করলেন না। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ‘প্রতিবাদী’ নেতার এমন অলিম্পিক-মার্কা সাইড কাটার টাইমিং সত্যিই দেখার মতো! কোথায় গেল সেই অনলাইন ফিটনেস আর কোথায় গেল মুখর বাকপটুতা?
গণতন্ত্র আর সুশাসনের মূল কথাই হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। রাজনীতির মাঠকে যারা ব্যক্তিগত সুবিধা হাসিলের হাতিয়ার বানাতে চান, কিংবা ভাবেন সময়ে সময়ে রঙ বদলে বেঁচে যাওয়া যাবে, তাদের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। ফেসবুক ওয়ালে বিপ্লবী সাজা বেশ সহজ, কিন্তু আইনের কাঠগড়ায় জবাবদিহি করা অতটা সহজ নয়। হাওয়া বুঝে কথা বলে আর তুষ্ট করার রাজনীতি করে দিনশেষে লাভ হয় না। দিনশেষে সত্যিটাই স্পষ্ট হলো, ভার্চুয়াল অনুসারী আর ভারী স্ট্যাটাস দিয়ে অন্তত রিয়েল এস্টেটের জমি বাঁচানো যায় না!
মুল খবর এখানে :
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরাদ্দ পাওয়া সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজের প্লট বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)
প্রচলিত আইন ও বরাদ্দের শর্ত মেনে এই প্লটটি দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।
এতে বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় নানা অসংঙ্গতি উঠে এসেছে। রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী সরকারের সাংসদ হিসেবে প্লট বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শুরুর দিকেই রয়েছে সোহেল তাজের নাম। তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে এ সংক্রান্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে প্লটটি বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানা যায়।
রাজউকের নথি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ২০১১ সালে বিশেষ কোটায় রাজউকের উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) আবাসিক এলাকায় পাঁচ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দ পান সোহেল তাজ। ওই বছরে অনুষ্ঠিত রাজউকের ষষ্ঠ বোর্ড সভায় উত্তরা আবাসিক এলাকার ১৬ নম্বর সেক্টরের ই-ব্লকের ১/এ নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লটটি তার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নথিতে প্লটটির আইডি নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে ১৬/ই-০১/এ-০০১। বরাদ্দসংক্রান্ত নথিতে সোহেল তাজের জন্মতারিখ ৫ জানুয়ারি ১৯৭০ এবং পিতার নাম হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজউক কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা টাউন ইমপ্রুভমেন্ট (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস, ১৯৬৯-এর ১৩(এ) ধারায় বিশেষ বিবেচনায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই ধারার আওতায় প্রধানমন্ত্রী অথবা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বিশেষ কোটায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় সোহেল তাজও একটি প্লট নেন।
বরাদ্দের নথিতে সোহেল তাজের বর্তমান ঠিকানা হিসেবে বাড়ি নম্বর ১৮/এ, রোড নম্বর ৩, পুরাতন ডিওএইচএস, ঢাকা উল্লেখ করা হয়েছে। স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়েছে গ্রাম-দরদরিয়া, ডাকঘর-ভুলেশ্বর, উপজেলা-কাপাসিয়া, জেলা-গাজীপুর। রাজউকের সংরক্ষিত কোটায় সংসদ সদস্য ক্যাটাগরিতে গাজীপুর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সোহেল তাজকে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়।
রাজউকের নথি অনুযায়ী, পাঁচ কাঠার প্লটটি বরাদ্দ পাওয়ার পর সোহেল তাজ রাজউকের কোষাগারে কাঠাপ্রতি মূল্য হিসেবে ৬ লাখ করে মোট ৩০ লাখ টাকা জমা দেন। পরবর্তী সময়ে প্লটটি তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। যার দলিলের নম্বর ৯৩২১ এবং হস্তান্তর তারিখ ৩০ জুলাই ২০১২। তবে প্লটটি বরাদ্দ নেওয়ার পর বেশিদিন নিজের দখলে রাখেননি সোহেল তাজ। ২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি প্লটটি তাসফিয়া কলিম ও লামিমা কলিম নামে দুই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন।
রাজউক কর্মকর্তারা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করছেন, ৫ কাঠা প্লটটি কমপক্ষে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে।
দেখা গেছে, সোহেল তাজের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লটটিতে বর্তমানে কোনো স্থাপনা নেই। আশপাশের বেশ কয়েকটি প্লটে ভবন নির্মাণের কাজ চললেও এটি খালি পড়ে আছে। সেখানে কোনো নামফলকও চোখে পড়েনি।
রাজউক কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা টাউন ইমপ্রুভমেন্ট (অ্যালটমেন্ট অব ল্যান্ডস) রুলস, ১৯৬৯-এর ১৩(এ) ধারায় বিশেষ বিবেচনায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এই ধারার আওতায় প্রধানমন্ত্রী অথবা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বিশেষ কোটায় প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ায় সোহেল তাজও একটি প্লট নেন।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলেই এই ধারায় বিশেষ কোটায় প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই ধারায় যাদের নামে প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো আইন ও বরাদ্দের শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা বর্তমানে যাচাই করছে রাজউক। এই বিষয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্লটগুলো বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে রাজউক এবং প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে রোবার (৯ আগস্ট) দুপুরে সাবেক সংসদ সদস্য সোহেল তাজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। প্লটের বিষয়ে শুনেই ফোনটি কেটে দেন তিনি। পুনরায় তাকে কল দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।
রাজউকের চেয়ারম্যানের ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি প্লটগুলোর তালিকা পর্যালোচনা করেছে। এখন সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়। এখানে রাজউকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’