বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন, ব্রিকলেন নিউজ, ঢাকা:
নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে তৈরি হয়েছে গভীর সংকট। জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় আয় বাড়েনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে। ফলে আয়ের সাথে ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনে সঞ্চয় ভেঙে ফেলা কিংবা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ার ঘটনা নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতির ধাক্কা ও টানাপোড়েনের সংসার
বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস ও শাকসবজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে চড়া থাকায় পরিবারের বাজেটে বড় ধরনের টান পড়েছে। খাদ্য ব্যয়ের পাশাপাশি সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, পরিবহন ভাড়া এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ ও পানির বিলের মতো অনুষঙ্গগুলো টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করছে। সীমিত আয়ের চাকুরিজীবী ও ক্ষুদ্র পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে খাদ্য তালিকা থেকে পুষ্টিকর উপাদান কাটছাঁট করা এখন প্রায় স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আয়ের সীমাবদ্ধতা ও সঞ্চয় সংকট
বেসরকারি খাত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমে নিয়োজিত বিপুল জনগোষ্ঠীর মজুরি মূল্যস্ফীতির হারের সাথে সঙ্গতি রেখে বাড়েনি। উল্টো উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয়ের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় তো দূরের কথা, অতীতের সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকে জমানো টাকা ভেঙে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বা পরিবারে কোনো অপ্রত্যাশিত ব্যয় সামনে এলে অনেকেই ধারদেনা ও চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার ফাঁদে আটকে পড়ছেন।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাজার ব্যবস্থাপনা
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি পণ্যের মূল্যের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা ও দুর্বল বাজার মনিটরিং এই পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে। বাজার কারসাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এবং খাদ্য পণ্যের আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা সাধারণ ভোক্তার পর্যায়ে না পৌঁছালে এ চাপ সহসা কমবে না। অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা এবং মজুরি বৃদ্ধির স্থবির গতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা
সাধারণ মানুষের এই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির পরিসর আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি ওএমএস কর্মসূচি শহরের বাইরেও বিস্তৃত করা এবং সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তার পরিধি বাড়ানোর দাবি উঠছে। দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরানো সম্ভব নয়।