বিজ্ঞানীরা অ্যালঝেইমার্স (Alzheimer’s) এবং ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ায় (FTD) আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কের কোষ কীভাবে মারা যায়, তার একটি অজানা প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন। ‘ক্যারিওপটোসিস’ (Karyoptosis) নামের এই নতুন প্রক্রিয়ার আবিষ্কার মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর এই ভয়াবহ রোগগুলোর অগ্রগতি ধীর করার ক্ষেত্রে চিকিৎসার নতুন পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরোসিস (ALS), অ্যালঝেইমার্স এবং এফটিডি-র মতো স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত বা নিউরোডিজেনারেটিভ রোগগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিউরন বা স্নায়ুকোষের ভেতরে ক্ষতিকর প্রোটিনের জমাট বাঁধা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কোষগুলো মারা যায়, যার ফলে স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই ‘অ্যাপোপটোসিস’সহ কোষ মৃত্যুর বেশ কয়েকটি ধরন সম্পর্কে জানতেন। তবে এগুলো দিয়ে এই রোগগুলোতে এত বিপুল পরিমাণ নিউরন ধ্বংসের বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডন, ইউকে ডিমেনশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং অ্যালঝেইমার্স রিসার্চ ইউকে-এর গবেষকদের যৌথ এই গবেষণায় ‘ক্যারিওপটোসিস’-কে সেই হারানো যোগসূত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ক্ষতিকর প্রোটিনের জমাট বাঁধার সঙ্গে মস্তিষ্কের কোষের মৃত্যুকে সরাসরি যুক্ত করে।
ক্যারিওপটোসিস আসলে কী? গবেষকদের মতে, ক্যারিওপটোসিস হলো ধারাবাহিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার একটি রূপ। কোষের ভেতরে ক্ষতিকর প্রোটিন জমা হওয়ার কারণে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলে কোষের নিউক্লিয়াসের (যেখানে জেনেটিক বা জিনগত উপাদান থাকে) বাইরের আবরণ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে এটি সংকুচিত হয়ে পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং কোষটি মারা যায়।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ (Nature Communications) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অ্যালঝেইমার্স ও এফটিডিতে আক্রান্ত ২৮ জন রোগী এবং সুস্থ মানুষের মস্তিষ্ক থেকে সংগৃহীত ৩,০০০ কোষ বিশ্লেষণ করেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অ্যালঝেইমার্সে আক্রান্তদের ফ্রন্টাল কর্টেক্সের ৩৫ শতাংশ কোষেই ক্যারিওপটোসিসের লক্ষণ রয়েছে। অন্যদিকে সুস্থ বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ।
নতুন চিকিৎসার সম্ভাবনা গবেষকরা কোষ মৃত্যুর এই প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণকারী একটি আণবিক পথও (Molecular pathway) খুঁজে পেয়েছেন। ইঁদুরের নিউরন ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, ‘কাইনেজ’ (Kinase) নামের কিছু প্রোটিন এই প্রক্রিয়ায় সুইচের মতো কাজ করে। বিশেষ করে ‘p38 MAP কাইনেজ’ এবং ‘LaminB1’ নামের প্রোটিনের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া নিউক্লিয়াসের ভাঙন রোধ করার ক্ষেত্রে একটি প্রতিশ্রুতিশীল লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে। কাইনেজ প্রোটিনের কাজ বন্ধ করে দিয়ে বিজ্ঞানীরা ক্যারিওপটোসিসের হার কমাতেও সক্ষম হয়েছেন।
কিংস কলেজ লন্ডনের ফাংশনাল জিনোমিকসের রিডার ড. মানোলিস ফ্যান্টো বলেন, “p38 MAP কাইনেজ এবং LaminB1-এর মিথস্ক্রিয়াকে লক্ষ্য করে আমরা কোষ মৃত্যুর প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারি। এটি নির্দিষ্ট স্নায়বিক রোগগুলোর জন্য আরও সূক্ষ্ম ও উন্নত চিকিৎসা উদ্ভাবনে আমাদের কিছুটা বাড়তি সময় এনে দেবে।”
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও ইউকে ডিমেনশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক ড. রেবেকা কাস্টারটন বলেন, “মস্তিষ্কের কোষে মৃত্যু ঘটানোর ধারাবাহিক রাসায়নিক ঘটনাগুলো আমরা উন্মোচন করেছি এবং ক্যারিওপটোসিসের কাজের একটি রূপরেখা তৈরি করেছি। এটি ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আমি আশাবাদী।”
অ্যালঝেইমার্স রিসার্চ ইউকে-এর সিনিয়র রিসার্চ ম্যানেজার ড. সারা রদ্রিগেজ এই আবিষ্কারকে স্মৃতিভ্রংশের নিরাময় খোঁজার পথে এক ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।