বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের এমন একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যার মাধ্যমে সিস্টেমটির আচরণ দেখে মনে হবে সময় সামনের দিকে না এগিয়ে যেন পেছনের দিকে বইছে। ‘ফিজিক্যাল রিভিউ এক্স’ (Physical Review X) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় কোয়ান্টাম নিয়ন্ত্রণের এমন কিছু নতুন প্রোটোকল তুলে ধরা হয়েছে, যা মূলত সিস্টেমের ‘অ্যারো অব টাইম’ বা ‘সময়ের তির’-এর (সময় কেবল একমুখী বা সামনের দিকে চলে—এমন ধারণা) প্রচলিত গতিপথকে পাল্টে দিতে পারে। যুগান্তকারী এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম সিস্টেম থেকে শক্তি আহরণের নতুন পদ্ধতির দ্বার উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কোয়ান্টাম সিস্টেম, যেমন—কিউবিটের (qubits) কোনো গ্রুপ, সাধারণ বা ধ্রুপদি পদার্থবিজ্ঞানের বদলে কোয়ান্টাম মেকানিকসের নিয়ম মেনে চলে। সদ্য আবিষ্কৃত এই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে গবেষকরা সময়ের স্বাভাবিক একমুখী প্রবাহকে দমন করতে বা এর আপাত দিক উল্টে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে গবেষক দলটি একটি ‘মেজারমেন্ট ইঞ্জিন’ বা পরিমাপক ইঞ্জিনও তৈরি করেছেন, যা কোয়ান্টাম পরিমাপ করার প্রক্রিয়া থেকেই শক্তি সংগ্রহ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির পদার্থবিদ লুইস পেড্রো গার্সিয়া-পিন্টোস বলেন, “আমাদের চারপাশে আমরা যেসব সাধারণ ঘটনা ঘটতে দেখি, আণুবীক্ষণিক স্তরে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্রগুলো তার চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে। সেখানে সময়ের সামনে বা পেছনে—উভয় দিকেই চলা সম্ভব। অর্থাৎ, পদার্থবিজ্ঞানের এই সূত্রগুলো সময় উল্টে দিলেও সমানভাবে কাজ করে। কোয়ান্টাম সিস্টেমের জন্য আমরা যে টুলগুলো তৈরি করেছি, তা সময়ের এই আপাত দিককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; যা কোয়ান্টাম সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি বিস্ময়কর ও অভিনব পথ।”
সময়ের বিপরীতমুখী আচরণ নিয়ন্ত্রণ দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানে কোনো কিছু পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপ করলে তা বস্তুর ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলে না। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কোনো সিস্টেমকে পরিমাপ করলেই তার অবস্থার এলোমেলো পরিবর্তন ঘটে এবং প্রাকৃতিকভাবেই সেখানে একটি ‘সময়ের তির’ তৈরি হয়।
এই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে গবেষকরা পরিমাপের পাশাপাশি একটি ‘ফিডব্যাক’ বা প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা যুক্ত করেছেন। এটি কোয়ান্টাম সিস্টেমগুলোকে এমন এক পথে চলতে বাধ্য করে, যা দেখে মনে হয় সময় পেছনের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। একটি সুনিয়ন্ত্রিত ‘কন্ট্রোল হ্যামিলটোনিয়ান’ (যা মূলত ক্ষেত্র ও তরঙ্গের একটি সুপরিকল্পিত বিন্যাস) ডিজাইনের মাধ্যমে তারা এটি অর্জন করেছেন। এটি পরিমাপের ফলে সৃষ্ট ব্যাঘাতকে বাতিল বা সংশোধন করতে পারে। ফলে সিস্টেমটি এমন গতিপথ তৈরি করতে পারে, যা সময়ের প্রসারিত, অস্পষ্ট বা বিপরীতমুখী প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কোয়ান্টাম জগতের ‘ম্যাক্সওয়েলস ডেমন’ ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ‘ম্যাক্সওয়েলস ডেমন’ (Maxwell’s demon) চিন্তন পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই এই নতুন গবেষণাটি দাঁড়িয়েছে। সেই কাল্পনিক পরীক্ষায় একজন পর্যবেক্ষক গরম ও ঠান্ডা কণাগুলোকে আলাদা করে এন্ট্রপি কমিয়ে আনেন, যা তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের (যেখানে এন্ট্রপি বা বিশৃঙ্খলা সবসময় বাড়ে) পরিপন্থী বলে মনে হয়।
লস আলামোস ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের তৈরি এই কোয়ান্টাম ‘ডেমন’ মূলত কোয়ান্টাম সিস্টেমের অবস্থা ও পরিমাপের তথ্য ব্যবহার করে ঠিক একইভাবে অস্বাভাবিক আচরণের জন্ম দেয়। এটি কার্যকরভাবে সিস্টেমের প্রাকৃতিক ‘সময়ের তির’ বা সম্মুখমুখী প্রবাহকে উল্টে দেয়।
পরিমাপ থেকে শক্তি আহরণ নতুন এই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিজ্ঞানীদের কোয়ান্টাম সিস্টেমের ভেতরে ও বাইরে শক্তির আদান-প্রদানকে প্রভাবিত করারও সুযোগ করে দিয়েছে। এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি নিরবচ্ছিন্ন ‘মেজারমেন্ট ইঞ্জিন’ চালানো সম্ভব, যা সরাসরি নজরদারি বা পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া থেকেই কার্যকর শক্তি আহরণ করতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় কোয়ান্টাম পরিমাপ পদ্ধতি নিজেই একটি তাপগতীয় সম্পদে পরিণত হয়। এই শক্তি কাজে লাগিয়ে অন্য কোনো কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া পরিচালনা করা যেতে পারে কিংবা ‘কোয়ান্টাম ব্যাটারি’-তে তা সঞ্চয় করেও রাখা সম্ভব।
ভবিষ্যতে গবেষকরা সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট ব্যবহার করে এই কোয়ান্টাম ফিডব্যাক কন্ট্রোলের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরিকল্পনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তর (DOE), লস আলামোসের অ্যাডভান্সড সিমুলেশন অ্যান্ড কম্পিউটিং প্রোগ্রাম এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের (NSF) অর্থায়নে যুগান্তকারী এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।