স্পোর্টস ডেস্ক, ব্রিকলেন নিউজঃ
টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচটি কেবলই বিশ্বকাপের একটি নকআউট লড়াই ছিল না; এটি পরিণত হয়েছিল রেকর্ড, রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা এবং অসীম আবেগের এক মহাকাব্যে। ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করার রাতে পর্তুগিজ অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো শুধু ইতিহাসই গড়েননি, প্রয়াত সতীর্থ দিয়োগো জোতাকে স্মরণ করে কাঁদিয়েছেন পুরো ফুটবল বিশ্বকে।
বেদনার ৩ জুলাই এবং একটি ‘২১ নম্বর’ জার্সিঃ
ক্যালেন্ডারের পাতায় ৩ জুলাই তারিখটি পর্তুগিজ ফুটবল ভক্তদের জন্য একটি বিষাদময় দিন। ঠিক এক বছর আগে, স্পেনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পর্তুগালের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফরোয়ার্ড দিয়োগো জোতা এবং তার ভাই আন্দ্রে সিলভা। মৃত্যুর মাত্র ১১ দিন আগে রুতে কারদোসোর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন জাতীয় দলের হয়ে ৪৯ ম্যাচে ১৪ গোল করা এই তারকা।
ম্যাচ শেষে পর্তুগাল যখন জয়োৎসবে ভাসছে, রোনালদো তখন ড্রেসিংরুম থেকে জোতার সেই চিরচেনা ‘২১ নম্বর’ জার্সিটি নিয়ে মাঠে ফেরেন। জার্সিটি বুকে জড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সিআরসেভেন। অধিনায়কের এমন আবেগঘন মুহূর্তে উদযাপনের রং পালটে যায় শোকে; কোচ রবের্তো মার্তিনেজসহ পুরো দল এসে সান্ত্বনা দেন তাকে।
স্পোর্ট টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোনালদোর কণ্ঠেও ছিল সেই আবেগের প্রতিধ্বনি, “আমরা বিশ্বাস করি জোতা আমাদের সঙ্গেই আছে, ওপর থেকে আমাদের দেখছে। আজকের এই জয়টা শুধুই তার জন্য। তাকে সম্মান জানানোর এর চেয়ে নিখুঁত কোনো উপায় হতে পারে না।”
মাঠের লড়াই ও নতুন ইতিহাসঃ
আবেগঘন এই রাতেই রোনালদো বিশ্বকাপের রেকর্ডবই নতুন করে লিখেছেন। ম্যাচের ৬৮তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারের (৪১ বছর ১৪৭ দিন) খেতাব অর্জন করেন।
শুধু তাই নয়, এই ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শুরুর একাদশে খেলা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়ও হয়েছেন তিনি। ক্রোয়েশিয়ার ৪০ বছর বয়সী লুকা মডরিচের বিপক্ষে মাঠে নেমে বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুই চল্লিশোর্ধ্ব তারকার নকআউটে মুখোমুখি হওয়ার বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপিত হয়েছে। এটি ছিল রোনালদোর ২৬তম বিশ্বকাপ ম্যাচ; আর মাত্র একটি ম্যাচ খেললেই তিনি ছুঁয়ে ফেলবেন জার্মান কিংবদন্তি লোথার ম্যাথাউসের ২৭ ম্যাচের চূড়া।
নাটকীয় ফিনিশিং ও স্পেনের চ্যালেঞ্জঃ
ম্যাচের গতিপথও ছিল রোমাঞ্চে ভরপুর। ইভান পেরিসিচের গোলে প্রথমে পিছিয়ে পড়েছিল পর্তুগাল। তবে রোনালদোর পেনাল্টিতে সমতায় ফেরার পর, ইনজুরি সময়ের চতুর্থ মিনিটে (৯০+৪) গনসালো রামোসের দুর্দান্ত হেডে জয় নিশ্চিত করে পর্তুগিজরা। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগমুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার গাভার্দিওলের একটি গোল ভিএআর (VAR) প্রযুক্তিতে বাতিল না হলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।
তবে ভাগ্য হয়তো এদিন জোতার স্মৃতিরক্ষার্থেই পর্তুগালের পক্ষে ছিল। এই শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর, কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল মুখোমুখি হতে যাচ্ছে শক্তিশালী স্পেনের। একবুক আবেগ আর নতুন ইতিহাসের প্রেরণা নিয়ে পর্তুগাল এখন পরবর্তী চ্যালেঞ্জের অপেক্ষায়।