দৈনিক কালবেলার অনলাইনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষা শীর্ষক আজ প্রকাশিত জরিপটির ফলাফল দেখলাম। প্রশ্নটি ছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর কোটা, বৈষম্য ও দুর্নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশা দূর হয়েছে কি না। ফলাফল দেখে আনন্দে আমার চোখে জল চলে এসেছে! ১৫১২ জন ভোটদাতার মধ্যে ৮৮ দশমিক ৮২ শতাংশ মানুষ নির্দ্বিধায় বলে দিয়েছেন, “না!”।
ভাবতে অবাক লাগে, দেশের মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কীভাবে হয়! দীর্ঘ দুই বছর ধরে আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন দেখছি, আর আপনারা কিনা বলছেন হতাশা দূর হয়নি? আসুন, একটু তলিয়ে দেখি এই হতাশার আসল কারণগুলো কী।

আমাদের উদ্ভাবনী দুর্নীতি দুর্নীতি যে দূর হয়নি, এই কথা যারা বলছেন, তারা আসলে আধুনিক যুগের সিস্টেমের সৌন্দর্যটাই বোঝেন না। এখন সবকিছু অত্যন্ত স্বচ্ছ। আপনি কাজ নিয়ে যাবেন, আপনার ফাইল টেবিলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার জন্য যে ‘গতিশীলতা ফি’ বা স্পিড মানি দিতে হয়, সেটা এখন একেবারেই ওপেন সিক্রেট। একে কি দুর্নীতি বলা যায়? এটি তো অর্থনীতির চাকা সচল রাখার একটি আধুনিক এবং গতিশীল প্রক্রিয়া! বৈষম্য দূর করার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে যে, এখন পকেটে জোর থাকলে যে কেউ কাজ বাগিয়ে নিতে পারে?
বৈষম্যের নতুন সংজ্ঞা আপনারা কোটা আর বৈষম্যের কথা বলে গলা ফাটান। অথচ দেখুন, এখন সব জায়গায় কেমন চমৎকার এক অদৃশ্য সিস্টেম চালু হয়েছে! আপনাকে শুধু সঠিক মানুষের সঠিক আত্মীয় হতে হবে, অথবা সঠিক স্লোগানটি সঠিক সুরে গাইতে জানতে হবে। মেধার চেয়ে এখন ভক্তি আর স্তুতির কদর অনেক বেশি। এটি কি বৈষম্য? মোটেই না। এটি হলো নিখাদ আনুগত্যের পুরস্কার! যারা এই নতুন সিস্টেমে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারেননি, সেই ৮৮ দশমিক ৮২ শতাংশ মানুষ তো হতাশ হবেনই।
আশার আলো ওই ৮ শতাংশ তবে জরিপের ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষের জন্য আমার গভীর শ্রদ্ধা। তারা বুক ফুলিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। তারা কারা জানেন? তারা হলেন সেই আলোকিত মানুষ, যারা এই হতাশার বাজারেও নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে পেরেছেন। হতে পারে তারা সেই নব্য ঠিকাদার, যাদের বিল রাতারাতি পাস হয়ে যায়। কিংবা সেই ব্যক্তি, যিনি কালকের মধ্যে বিশাল ক্ষমতার মালিক হয়ে গেছেন। তাদের হতাশা পুরোপুরি দূর হয়েছে, কারণ তারা এখন এই নতুন সিস্টেমের গর্বিত চালক।
নীরবতার ভাষা আর ওই ২ দশমিক ১৮ শতাংশ মানুষ, যারা ‘মন্তব্য নেই’ বলে সন্তর্পণে এড়িয়ে গেছেন, তারা আসলে সমাজের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। তারা জানেন, বেশি কথা বললে পাছে আবার ‘অদৃশ্য’ কোনো খাতায় নাম উঠে যায়! তাই এই গণতান্ত্রিক সমাজে বোবা হয়ে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর।
পরিশেষে বলি, জুলাইয়ের এই দুই বছরে আমরা অনেক চমৎকার জিনিস শিখেছি। আমরা জেনেছি কীভাবে মানুষকে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলতে হয়। সাধারণ মানুষের এই বিপুল হতাশা আসলে কোনো ব্যর্থতা নয়। এটি আমাদের এক নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং বিনা ভাড়ায় হতাশ হওয়ার অধিকার পান!
নির্বাহী সম্পাদক, ব্রিকলেন নিউজ।