অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। দেশ পেল এক নতুন রাজনৈতিক দল। তবে এটি কোনো পঁচিশ বছরের পুরনো অভিজ্ঞতার ঝুলি কিংবা কোনো প্রবীণ নেতার ইশতেহার নয়। এবারের পার্টির নাম ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’।
সৌজন্যে কে? আমাদের অতি বিদগ্ধ এবং জনবান্ধব শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়।
ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ। দেশজুড়ে চলছে প্রবল বর্ষণ আর জলমগ্ন সড়ক। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা তো আর মাছ নয় যে, বৃষ্টির পানিতে সাঁতরে কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দেবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের মতে, এরা আসলে পরীক্ষার্থী নয়, এরা সবাই ‘ফার্মের মুরগি’।
একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই নাকি এদের জ্বর চলে আসে। বাহ! কী দারুণ অন্তর্দৃষ্টি! মন্ত্রী মহোদয়ের এই দার্শনিক মন্তব্যের পরই তো তরুণ প্রজন্ম বুঝে গেল তাদের প্রকৃত পরিচয়। তারা আর নিজেদের কেবল শিক্ষার্থী মনে করে না, তারা এখন ‘ব্রয়লার প্রজন্ম’।
এই ‘ব্রয়লার প্রজন্ম’ এখন আর চুপ করে বসে নেই। তারা সশরীরে রাজপথে নেমে পড়েছে, স্লোগান তুলছে,‘আমি কে, তুমি কে, ফার্মের মুরগি!’ কী অপূর্ব সৃষ্টিশীল প্রতিবাদের ভাষা! একজন শিক্ষামন্ত্রীর মুখ থেকে যখন শিক্ষার্থীরা এমন অনুপ্রেরণামূলক বিশেষণ শুনতে পায়, তখন তাদের সৃজনশীলতা যে তুঙ্গে উঠবে, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? মন্ত্রী মহোদয় কি জানতেন, তিনি কেবল একটি মন্তব্য করেননি, তিনি কার্যত একটি বিশাল সামাজিক আন্দোলনের জন্মদাতা হয়ে গেলেন?
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র স্লোগান, ‘আমরা ব্রয়লার প্রজন্ম, আমরা অপমানিত নই, আমরা জাগ্রত’।
মন্ত্রী মহোদয় হয়তো ভেবেছিলেন গালি দিয়ে তাদের ছোট করবেন, কিন্তু তিনি আসলে তাদের এক সুতোয় বেঁধে দিলেন। এখন সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ, এমনকি চট্টগ্রাম থেকে রংপুর, সর্বত্রই ব্রয়লারদের জয়জয়কার।
রাজনীতিতে সাধারণত দেখা যায় নেতাদের ইশতেহার পড়ে সাধারণ মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় কাকে ভোট দেবে। আর এখানে উল্টো! শিক্ষামন্ত্রীর ইশতেহার শুনে সাধারণ মানুষ এখন নিজেরাই রাজনৈতিক দল খুলে বসেছে।
দেশের রাজনীতিতে এমন হাস্যকর এবং বিদ্রূপাত্মক মোড় আসার জন্য কি আমরা প্রস্তুত ছিলাম? শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ দিতেই হয়, কারণ তিনি তার ফোনালাপের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি দায়িত্বশীল পদে বসে দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলে দেশের তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির মাঠে নামিয়ে আনা যায়।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ত্রুটি থাকুক বা না থাকুক, আমাদের রাজনীতির প্রশ্নপত্রে যে বড় ধরনের গোলমাল পাকিয়ে গেছে, তা এই ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’র উত্থান দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মন্ত্রী মহোদয় নিশ্চয়ই এখন ভাবছেন, ফার্মের মুরগিগুলোকে বেশি নাড়াচাড়া করা ঠিক হয়নি।
এই যে নতুন প্রজন্মের এই জাগরণ, এটি কি কেবলই ক্ষোভ? নাকি এটি সেই পুরনো জরাজীর্ণ রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক? মন্ত্রী মহোদয়দের কাছে বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আর কাউকে ‘মুরগি’ বা অন্য কিছু বলবেন না। কে জানে, এরপর হয়তো ‘খাসি পার্টি’ কিংবা ‘গরু পার্টি’ও গড়ে উঠতে পারে। আর তখন হয়তো সাধারণ মানুষকে আর রাজপথে নামতে হবে না, নিজেরাই পার্লামেন্টে গিয়ে বলবে, ‘মহামান্য মন্ত্রী, মুরগি তো পাললাম, এবার মানুষের মর্যাদাটা কি দেবেন?’
(লিখেছেন, কলম সৈনিক-আহমেদ তৌফিক : যিনি মন্ত্রীর ডিকশনারি থেকে নতুন শব্দের অর্থ খুঁজছেন )