ঢাকা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুলগুলো গর্ভপাত থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতে মানুষের মূল বার্তাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করছে। প্রযুক্তির এই হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে জনমতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
অক্সফোর্ড এবং পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বার্তা পুনরায় লেখা (Redraft) বা সারসংক্ষেপ (Summarise) করার সুবিধার্থে টেক জায়ান্টরা যেসব এআই টুল সরবরাহ করছে, সেগুলো মানুষের লেখার ওপর নিজস্ব রাজনৈতিক পক্ষপাত চাপিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যে কিছু এআই মডেল স্পষ্টভাবে ডানপন্থী, আবার কিছু উদারপন্থী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
যেভাবে বদলে যাচ্ছে বার্তার মূল অর্থ গবেষকরা দেখেছেন, এআই ড্রাফটিং টুলগুলো অনেক ক্ষেত্রে খসড়া পোস্টের অর্থ সম্পূর্ণ উল্টে দিচ্ছে। একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, নাস্তিকতা নিয়ে লেখা একটি খসড়া পোস্টে যেখানে দাবি করা হয়েছিল “যিশু বলে কেউ ছিলেন না”, এআই টুল সেটি পরিবর্তন করে লিখেছে, “যিশু… সত্যিই ছিলেন।”
আরেকটি উদাহরণে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনকে গুজব দাবি করে লেখা একটি পোস্টকে (যেখানে #climatechangehoax ব্যবহার করা হয়েছিল) ফ্রান্সের মিস্ট্রাল (Mistral) এআই সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে জলবায়ু সংকট নিয়ে উদ্বেগের বার্তায় রূপান্তর করে এবং হ্যাশট্যাগ পরিবর্তন করে লেখে #ClimateAction। এমনকি বৈবাহিক জীবনে কঠোর লৈঙ্গিক ভূমিকার পক্ষে লেখা একটি পোস্টকে বদলে দিয়ে মিস্ট্রাল লিখেছে, “আদর্শ বিবাহ সমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে—কঠোর লৈঙ্গিক ভূমিকার ওপর নয়।”
টেক জায়ান্টদের মডেলে রাজনৈতিক পক্ষপাত অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট এবং হাসো প্ল্যাটনার ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ইলন মাস্কের এক্সএআই (xAI), মেটা, গুগল, চীনের আলিবাবা এবং ফ্রান্সের মিস্ট্রালের মতো মূলধারার বৃহৎ ভাষা মডেলগুলোর (LLM) আচরণ পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখতে পান, মূল লেখার অর্থ অক্ষুণ্ন রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও এই এআই টুলগুলো তাতে নিজেদের পক্ষপাত ঢুকিয়ে দেয়।
গবেষণায় দেখা যায়, মেটা, গুগল, আলিবাবা (কিউয়েন) এবং মিস্ট্রালের এআই মডেলগুলোর মধ্যে নারীবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্দুক নিয়ন্ত্রণ এবং মারিজুয়ানা বৈধকরণের মতো বিষয়গুলোতে উদারপন্থী (Liberal) পক্ষপাত রয়েছে।
অন্যদিকে ইলন মাস্কের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ যুক্ত করা ‘গ্রোক’ (Grok)-এর “explain this” ফিচারে বিপরীত রাজনৈতিক পক্ষপাত দেখা গেছে। গর্ভপাত ইস্যুতে গ্রোককে প্রশ্ন করা হলে এটি প্রো-চয়েস (গর্ভপাতের অধিকার) অবস্থানের চেয়ে প্রো-লাইফ (গর্ভপাতবিরোধী) অবস্থানকে বেশি সমর্থন করে এমন উত্তর ও প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
আলিবাবার ‘কিউয়েন’ (Qwen) এআই-কে যখন “ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিণতি হিটলারের মতো হবে” এমন একটি খসড়া পোস্ট উন্নত করতে বলা হয়, তখন এটি সোজা উত্তর দেয়: “জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে এমন তুলনা করা বিপজ্জনক এবং অসম্মানজনক। আসুন আমরা গঠনমূলক সংলাপে মনোযোগ দিই।”
‘জ্ঞানের দ্বাররক্ষী’ হিসেবে এআই এবং জবাবদিহির অভাব গবেষকদের মতে, লক্ষ লক্ষ ইন্টারঅ্যাকশনের মাধ্যমে খসড়া বার্তাগুলোর অর্থে এআইয়ের এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো দীর্ঘমেয়াদে জনমতের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’ বা ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’-এর মতো নীতিমালায় এই বিষয়টি এখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা একটি “মারাত্মক জবাবদিহির শূন্যতা” তৈরি করছে।
গবেষণাপত্রের সহ-লেখক অধ্যাপক সান্দ্রা ওয়াচটার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে এআইয়ের এই পক্ষপাত ঢোকানোর বিষয়টিকে “বনভূমি দূষিত করার” সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “এর বড় মূল্য হলো, আমরা অন্যের প্রকৃত মতামতের বদলে এআইয়ের শেখানো মতামত জানছি। ভাষা হলো সেই মাধ্যম যা আমাদের মানুষ করেছে, আর এখন হঠাৎ করেই একজন মধ্যস্থতাকারী সেই প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়ছে। এআই জ্ঞান ও বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নিজেকে একজন দ্বাররক্ষী (Gatekeeper) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।”
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশনের অধ্যাপক ডানকান ব্রাম্বি বলেন, “এআই আপনার অর্ধেক গঠিত চিন্তার একটি চকচকে রূপ দিতে পারে। কিন্তু বিপদের জায়গা হলো, এই চাকচিক্য আনতে গিয়ে আপনি আসলে যা বোঝাতে চেয়েছিলেন, তার নিজস্বতার ধার বা স্বকীয়তা মুছে ফেলা হচ্ছে।”
এই চাঞ্চল্যকর গবেষণার বিষয়ে গুগল, মেটা, আলিবাবা এবং এক্স-এর কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। ফরাসি প্রতিষ্ঠান মিস্ট্রালও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।