ঢাকা: দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশের অজানা রহস্য উন্মোচন করা নাসার ‘সুইফট স্পেস টেলিস্কোপ’ (Swift Space Telescope) পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ধ্বংস হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়েছিল। ঐতিহাসিক এই টেলিস্কোপটিকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে প্রথমবারের মতো একটি রোবোটিক রেসকিউ মিশন বা উদ্ধারকারী মহাকাশযান পাঠিয়েছে নাসা। ‘লিংক’ (LINK) নামের এই বেসরকারি মহাকাশযানটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
কেন বিপদে পড়ল সুইফট? ২০০৪ সালে মহাকাশের গামা-রশ্মির বিস্ফোরণসহ নানা মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য ‘নিল গেহ্রেলস সুইফট অবজারভেটরি’ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। অত্যন্ত সফল এই টেলিস্কোপটি এখনো নতুন নতুন আবিষ্কার করে চলেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের শুরু থেকে শক্তিশালী সৌর কার্যক্রমের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কিছুটা প্রসারিত হয়। এর ফলে নিম্ন কক্ষপথে থাকা বস্তুগুলোর ওপর অতিরিক্ত ড্র্যাগ (Drag) বা চাপ তৈরি হয়।
২০২৫ সালের শুরুতে নাসার বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, সুইফট প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে নিচে নেমে আসছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ঐতিহাসিক উদ্ধার অভিযান টেলিস্কোপটিকে বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা এমন একটি রোবোটিক যান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, যা এর আগে কখনো করা হয়নি। এই রোবোটিক যানটি তার যান্ত্রিক হাতের সাহায্যে সুইফটকে ধরে পুনরায় উচ্চতর কক্ষপথে স্থাপন করবে। গত সেপ্টেম্বরে (২০২৫) এই মিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশযান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্টকে (Katalyst)। মাত্র ৯ মাসের প্রস্তুতি শেষে গত ৩ জুলাই মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ থেকে একটি রকেটের মাধ্যমে ‘লিংক’ উৎক্ষেপণ করা হয়।

আগামী কয়েক সপ্তাহ ‘লিংক’-এর সার্বিক কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করবেন অপারেটররা। এরপর প্রায় এক মাস ধরে এটি ধীরে ধীরে সুইফটের দিকে এগিয়ে যাবে এবং পৃথিবীতে ছবি পাঠাবে। সেই ছবি বিশ্লেষণ করে মিশন দল সুইফটকে ধরার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থানটি নির্বাচন করবে। রোবোটিক হাতের সাহায্যে সুইফটকে আঁকড়ে ধরার পর, ‘লিংক’ তার থ্রাস্টারগুলো ব্যবহার করে কয়েক মাস ধরে ধীরে ধীরে এটিকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার উচ্চতায়, অর্থাৎ এর আদি কক্ষপথে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
নাসার ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নাসার অন্যান্য টেলিস্কোপের তুলনায় সুইফট একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। মেরিল্যান্ডের গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট এবং এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক ব্র্যাড সেঙ্কো জানান, যেকোনো মহাজাগতিক বিস্ফোরণের পরপরই মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সুইফট সেদিকে ঘুরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করতে পারে, যেখানে হাবল টেলিস্কোপের অন্তত এক দিন সময় লাগে। ব্র্যাড সেঙ্কো বলেন, “এটি সত্যিই নাসার ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ বা প্রথম সাড়াদানকারী।”
বায়ুমণ্ডলের চাপ কমাতে গত ডিসেম্বর থেকেই সুইফটের পর্যবেক্ষণ কৌশল পরিবর্তন করা হয়েছে এবং বর্তমানে এর বিজ্ঞানভিত্তিক ডেটা সংগ্রহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। নতুন কক্ষপথে পৌঁছানোর পর অবজারভেটরিটি রিবুট করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে সুইফট আরও অন্তত এক দশক ধরে মহাকাশ গবেষণায় নতুন নতুন আবিষ্কার চালিয়ে যেতে পারবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই রোবোটিক উদ্ধার অভিযান সফল হলে ভবিষ্যতে হাবল স্পেস টেলিস্কোপসহ মহাকাশে থাকা অন্যান্য মূল্যবান স্যাটেলাইট ও টেলিস্কোপ উদ্ধারেও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে।