জুয়েল রাজ -সম্পাদক ও প্রকাশক, ব্রিকলেন নিউজ:
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ভারতের সরকারের আমন্ত্রণপত্রটি ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।তবে তারেক রহমান ওই সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি।
মূল বিষয় হচ্ছে, ঐতিহাসিক ভাবে ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের বন্ধু। মাঝে সেই বন্ধুত্ব কিছুটা শীতল হলেও ফের উভয় দেশই সুসম্পর্কের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তারই অঙ্গ হিসাবে ভারত প্রথমবারের মতো কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে হাইকমিশনার করে ঢাকায় পাঠিয়েছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের মাটিতে পা দিয়েই মন্তব্য করেন, ‘ভারত-বাংলার একই আকাশ একই বাতাস একই যন্ত্রণা, যা দুই দেশের জন্য ভালো হয়, সেই পদক্ষেপ সামনের দিনে নেব।’ কথা রেখেছেন দীনেশ ত্রিবেদী। ১২ জুন পেট্রাপোল-বেনাপোল হয়ে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। আর ২৮ জুন ফের চালু হয় ‘ট্যুরিস্ট ভিসা’ বা পর্যটন ভিসা। শুধু তাই নয়, ফের চালু হতে চলেছে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস। এমনকী, চার বছর পর ফের বাংলাদেশ সফরে আসছে ভারতীয় ক্রিকেট দল।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের গণহত্যার সময় ভারতই কোটি কোটি বাঙালির ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল ভারত। সর্বতোভাবে তারা আমাদের সাহায্য করে। এই বিষয়টি ফ্যাক্ট। আমরা যতভাবেই ভারত বিরোধীতা করি কিংবা ভারতের সাথে টানাপোড়েন ঘটুক, বাংলাদেশের জন্ম ও ভারতের ধাত্রী ভূমিকা কেউই এড়িয়ে যেতে পারব না।
মাঝে সম্পর্কের কিছু টানাপোড়েন হলেও উভয় দেশের মানুষ চিরকাল একে অন্যের আত্মীয় হিসাবে পাশে থেকেছেন। ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারত ।দেশের সাধারণ জনগণ আসলেই
বাংলাদেশের বন্ধু। বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠী ব্যাতিত আপামর সাধারণ জনগণ ভারতকে বন্ধু বলেই মনে করেন। সার্বভৌমত্ব ও আত্মসম্মান বজায় রেখে বর্তমান সরকারও ভারতসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়।
ভারতের বর্তমান হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে এসেই বন্ধুত্বের নয়া অধ্যায় রচনায় মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। ঢাকায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে নিজের আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদানের পরই তিনি প্রতিবেশী এই দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারত বহুমুখী অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে দিল্লির সদিচ্ছার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। দীনেশ ত্রিবেদী বুঝিয়ে দেন, দিল্লি আন্তরিকভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। বাংলাদেশের তরফেও মেলে ইতিবাচক সাড়া।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন তারেক রহমান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে কার্পণ্য করেননি। ভারতীয়লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লাকে তিনি তারেক রহমানের শপথ গ্রহণে পাঠান। তার আগেই অবশ্য জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপুল জয়ের খবর পেয়েই দলের সভাপতি তারেক রহমানকে টেলিফোনে অভিন্দন জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। দুই দেশের মানুষের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার কথা বলে তারা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তুলতে ষড়যন্ত্রকারীরা বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ষড়যন্ত্রকারীরা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু দিল্লি সবসময়ই বলে এসেছে বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তারা আগ্রহী। সাধারণ মানুষের স্বার্থে ভারতের বার্তা ছিল দৃঢ় এবং স্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষ বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতেই শুরু হয় পুনরায় সম্পর্কের উন্নতি।
পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় কুমার ভার্মার মেয়াদ ফুরাতেই ভারত দক্ষ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার করে ঢাকায় পাঠাতেই দ্রুত গতিতে মিটতে থাকে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে ফের চালু হয় পর্যটন বা ট্যুরিস্ট ভিসা। আবেদন গ্রহণ শুরুর আগে ভারতীয় হাইকমিশনার ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) নিজে পরিদর্শন করেন। তার নির্দেশে শুধু ঢাকাই নয়, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা-এই চারটি কেন্দ্র থেকেও ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়। সর্বত্রই মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা গিয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারতীয় ভিসার জন্য যেভাবে ভিড় করছেন সেটা দেখেই বোঝা যায় দুদেশের আত্মিক সম্পর্ক কতো গভীরে।

ভিসা চালুর পর এবার ফের দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ চালুর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের তরফে ভারতকে ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর অনুরোধ করা হতেই তৎপরতা শুরু করেছে ভারতীয় রেলে। ইতিমধ্যেই ভারত সরকারের তরফে রেলকে দ্রুততা সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। মৈত্রী চালুর পর কলকাতা-খুলনা বন্ধন এবং নিউ জলপাইগুড়ি-ঢাকা মিতালি এক্সপ্রেসও চালু হতে পারে। জাতীয় সংসদের সদস্য ডা. জয়ন্ত রায় জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই মিতালি এক্সপ্রেসও চালু হবে। ভারতীয় রেল সূত্রে খবর, আগের মতোই সপ্তাহে পাঁচ দিন চলবে মৈত্রী এক্সপ্রেস। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে তিনটি ট্রেনেরই যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে চাইছে উভয় দেশ।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে ঐকান্তিক চেষ্টা চালাচ্ছেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ রিয়াজ হামিদুল্লাহ। সম্প্রতি তিনি ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ লাগোয়া ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় একটি সরকারি বিনিয়োগ সম্মেলনে যোগ দেন। সেখানে তিনি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উন্নতিতে গুরুত্ব আরোপ করেন। বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলেছেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য’। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক সহযোগিতার পাশাপাশি সীমান্তের দুই প্রান্তের মানুষের আত্মিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরার অবদানের কথাও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির আরও একটি ইঙ্গিত মিলছে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনায়। ঠিক রয়েছে দীর্ঘ চার বছর পর বাংলাদেশ সফর করবে ভারতীয় ক্রিকেট দল। সাদা বলের এই সম্ভাব্য সিরিজের কথা মাথায় রেখে ভারত তাদের ক্রিকেট সূচিতে পরিবর্তন আনছে। অতি সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বৈঠকের ফাঁকে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) প্রতিনিধিদের সঙ্গে এবিষয়ে কথা হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালের। তামিম বলেছেন, ‘বছরের শেষে ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজ হওয়ার কথা আছে। আমি ভারতের খেলতে আসা নিয়ে আশাবাদী।
এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজ দেখতে উপভোগ করবে বাংলাদেশের মানুষ। ভারতের বিরুদ্ধে শেষ সিরিজে ভাল খেলেছিল বাংলাদেশ।’ এই সফরে ভারত তিনটি এক দিনের ম্যাচ এবং তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে। জানা গিয়েছে, ভারত সরকারের তরফে বিসিসিআইকে এবিষয়ে সবুজ সংকেত দেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই সপরসূচি চূড়ান্ত করবে উভয় দেশের বোর্ড।
এর মাঝেই , সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন ,তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব মামলা অভিযোগ আইনী ভাবে মোকাবেলা করবেন বলে জানিয়েছেন ,এবং এতে যদি তাঁর ফাঁসি ও হয় তিনি ভীত নন, বলে জানিয়েছেন । এই ঘোষণার পর, নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় ও আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঙা হয়ে উঠেছেন।এর পরেই ৫ আগস্ট একটি সভায় যোগ দেয়ার ঘোষোনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ভারতের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেছেন ,শেখ হাসিনা যেন ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা না করেন। এই অনুরোধ, ড: ইউনুসের সময় ও বারবার করা হয়েছে, কিন্ত ভারত শেখ হাসিনা বিষয়ে বারবারই কৌশলী থেকেছে।
ভারতকে অস্বীকার করে কিংবা বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের যেমন স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব নয়, তেমনি ভারতের পক্ষে ও ঝুঁকি থেকে যায়। যন্তর মন্তর আন্দোলে বাংলাদেশ থেকে একটি গোষ্ঠী সেখানে মোদি সরকার বিরোধী আন্দোলনে অনলাইনে খাবার ডেলিভারি দেয়ার সংবাদ ও দেখেছি আমরা।আবার বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় কাঁচামরিচ আমদানীর ফলে বাজারে দাম কমেছে কাঁচামরিচের ।
ভারত বাংলাদেশের এই সংযোগ কোন ভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। এসবকিছু নিয়েই দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ পুরোটাই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক । দুই দেশ সেভাবেই প্রসঙ্গটি নিয়ে এগিয়ে যাবে। কিন্ত দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যখন প্রভাব ফেলে তখন বিষয়টি কূটনীতির বাইরে চলে আসে।
সবমিলিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সুস্পর্কের দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন ও উভয় দেশের মানুষদের কল্যাণের স্বার্থে এমনটাই চাইছেন হয়তো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।