
এফ এম শাহীন-
৫ আগস্ট কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদল বা সরকারের পতন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সামষ্টিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় ও পতন।
ইতিহাসে কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, একটি জাতির বিবেক ও অন্তরাত্মার দর্পণ স্বরূপ। ৫ আগস্ট তারিখটি ক্যালেন্ডারে ফিরে আসে বহু রক্তক্ষয়, দীর্ঘ কান্না, জমে থাকা বহু প্রশ্ন এবং এক অসমাপ্ত আত্মজিজ্ঞাসার বেদনা নিয়ে।
ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন রাষ্টীয় কাঠামোয় যখন নীতি ও নৈতিকতার অপমৃত্যু ঘটে, তখন রাজনৈতিক পতনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সমাজের ভেতরকার মানবিক মূল্যবোধের ধসে পড়া। এবং এটি কীভাবে একটি গোটা জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গ্রাস করেছিল, ৫ আগস্ট তার নগ্ন দলিল।
৫ আগস্টকে শুধু পুলিশ হত্যা দিবস হিসেবে দেখলে এই দিনের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শুধু আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা কিংবা একটি সরকারের পতনের দিন হিসেবেও দেখলে এই দিনের গভীরতর মানবিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য আড়াল হয়ে যায়।
কারণ সহিংসতার অভিঘাত কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকসহ—বহু মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ ঘর হারিয়েছেন, কেউ নিরাপত্তাবোধ হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন কথা বলার সাহস।
তাই আমার কাছে ৫ আগস্ট কেবল আওয়ামী লীগের পতনের দিন নয়। ৫ আগস্ট—বাংলাদেশের পতন দিবস। এখানে ‘পতন’ বলতে ভূখণ্ডের পতন বোঝাচ্ছি না। বোঝাচ্ছি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির গভীর সংকটকে।
একটি রাষ্ট্রের পতন সবসময় তার পতাকা নামিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো পতন শুরু হয় মানুষের বিবেকের ভেতর থেকে।
ক্ষমতার পরিবর্তন আর রাষ্ট্রের পতন এক নয়। একটি সরকার পরিবর্তিত হবে, একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতা হারাবে-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটি স্বাভাবিক। কোনো দলই রাষ্ট্রের সমার্থক নয়, কোনো সরকারই চিরস্থায়ী নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নামে যদি মানুষের জীবন অনিরাপদ হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক পরিচয় যদি সহিংসতার অজুহাত হয়, নাগরিক অধিকার যদি দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা যদি আতঙ্কে থাকেন-তাহলে বিষয়টি আর কেবল ক্ষমতার পালাবদল থাকে না।
তখন প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে।
৫ আগস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই- কে ক্ষমতায় এলো আর কে ক্ষমতা হারাল, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, সেদিন আমরা রাষ্ট্র হিসেবে কী হারালাম?
মৃতদের কোনো দল নেই। রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটে তখন, যখন আমরা মৃত মানুষেরও দলীয় পরিচয় খুঁজতে শুরু করি। একজন নিহত মানুষের শেষ মুহূর্তে তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তার জীবনই সবচেয়ে বড় সত্য। তার পরিবার আছে, মা-বাবা আছে, সন্তান আছে, অসমাপ্ত স্বপ্ন আছে। যে মা সন্তান হারিয়েছেন, তাঁর কাছে মৃত সন্তান কোনো রাজনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। যে শিশুর বাবা আর ঘরে ফেরেননি, তার কাছে রাজনীতি কোনো তত্ত্ব নয়। যে বৃদ্ধ নিজের ঘরেই নিরাপদ নন, তাঁর কাছে ক্ষমতার পরিবর্তন কোনো উৎসব নয়।
তাই ৫ আগস্টের মৃত্যু ও সহিংসতার ইতিহাসকে দলীয় খণ্ডচিত্রে আটকে রাখা যায় না। নিহত পুলিশ সদস্য যেমন রাষ্ট্রের সন্তান, তেমনি নিহত রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী কিংবা কোনো নিরপরাধ নারী-শিশুও এই রাষ্ট্রেরই মানুষ।
মৃত্যুর কোনো দল নেই। অশ্রুর কোনো দল নেই। মানবিকতারও কোনো দল থাকা উচিত নয়।
বাহাত্তরের সংবিধান : রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন
১৯৭২-এর সংবিধান বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দলিল। এর পেছনে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, অসাম্প্রদায়িকতার আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্রের স্বপ্ন, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার। সংবিধান শুধু আইনের বই নয়। এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়েরও দলিল।
তাই ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন জাগে-আমরা কি শুধু ক্ষমতার কাঠামো বদলেছি, নাকি রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত কিছু মৌলিক মূল্যবোধকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছি?
সংবিধানের কোনো ধারা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু নাগরিক মর্যাদা, গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নকে যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিচে চাপা দেওয়া হয়, তাহলে সংবিধান কাগজে টিকে থাকলেও তার মর্যাদা বিপন্ন হয়।
বাংলাদেশ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে জন্ম নেয়নি। এই দেশের জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ এবং কোটি মানুষের স্বপ্ন। ‘ত্রিশ লাখ’ কেবল একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি প্রাণের পেছনে ছিল একটি পরিবার, একটি জীবন, একটি ভবিষ্যৎ।
কেউ সন্তান রেখে গেছেন। কেউ রেখে গেছেন বৃদ্ধ মা-বাবা। কেউ রেখে গেছেন অসমাপ্ত প্রেম। কেউ রেখে গেছেন এমন একটি ভবিষ্যৎ, যা তিনি নিজে কখনো দেখেননি। তাঁদের রক্তের বিনিময়ে যে রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি হতে পারে না।
শহীদের মর্যাদা বাংলাদেশের মর্যাদা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অপমান করা মানে শুধু অতীতকে অপমান করা নয়- নিজেদের জন্মকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়গুলোর একটি বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস। যাঁরা যুদ্ধের ভয়াবহ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাঁদের প্রতি কোনো ধরনের অবমাননা বা সামাজিক সন্দেহ আমাদের নিজেদের নৈতিক ব্যর্থতা।
মনে রাখা দরকার, বীরাঙ্গনারা লজ্জার নন। লজ্জা তাঁদের, যারা তাঁদের উপর পাশবিকতা চালিয়েছে। একটি জাতি তার নারীর মর্যাদা কতটা রক্ষা করতে পারে—তার উপরও সেই জাতির সভ্যতার মান নির্ভর করে।
সংস্কৃতির পতন মানে জাতির আত্মার পতন । বাংলাদেশ শুধু একটি ভূখণ্ড নয়। বাংলাদেশ তার ভাষা, বাংলাদেশ তার কবিতা, বাংলাদেশ তার গান, বাংলাদেশ তার নাটক বাংলাদেশ তার লোকসংস্কৃতি। বাংলাদেশ তার শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্মিলিত সৃষ্টিশীলতা। সাংস্কৃতিক কর্মীর ওপর আঘাত তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ঘটনা নয়।
একজন শিল্পীকে ভয় দেখানো মানে একটি সমাজের কল্পনাশক্তিকে ভয় দেখানো। একজন লেখককে থামানো মানে একটি সমাজের প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে সংকুচিত করা। একজন সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে সত্যের পথ সংকুচিত করা।
একটি রাষ্ট্রে যখন শিল্পী কথা বলার আগে চারপাশে তাকান, সাংবাদিক সত্য প্রকাশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন, লেখক প্রশ্ন করার আগে ভয় পান- তখন বুঝতে হয়, রাষ্ট্রের শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, সাংস্কৃতিক সংকটও তৈরি হয়েছে।
সংস্কৃতির ওপর আঘাত মানে জাতির আত্মার ওপর আঘাত।
বাংলাদেশের শক্তি তার বহুত্ব। এখানে মানুষের পরিচয় একরৈখিক নয়। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের বহু স্রোত মিলেই বাংলাদেশের সমাজ। ধর্ম মানুষের আত্মিক শক্তির উৎস হতে পারে। কিন্তু ধর্মকে যখন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র করা হয়, তখন প্রথমে আহত হয় ধর্মেরই মানবিকবোধ।
একজন নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীন হলে শুধু একজন মানুষ বিপন্ন হন না-রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের পরিচয় বিচার করা নয়; নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা।
৫ আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের নানা অভিযোগ আজ প্রমাণিত। ইতিহাস নিশ্চয়ই একদিন এসব অভিযোগের সত্যতা, মিথ্যা কিংবা বাস্তব ভূমিকা অনুসন্ধান করবে এবং বিচারও করবে।
তবে এর চেয়েও গভীর একটি সত্য আছে। বাইরের ষড়যন্ত্র তখনই একটি জাতিকে সহজে দুর্বল করতে পারে, যখন ভেতরের ভিত্তিমূলগুলো ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা কেবল সীমান্তে নয়-নাগরিকের পারস্পরিক আস্থায়।
আমরা সাধারণত পরাধীনতা বলতে বিদেশি শাসন বুঝি। কিন্তু পরাধীনতার একটি অদৃশ্য রূপও আছে। যখন মানুষ সত্য বলতে ভয় পায়, সেটিও পরাধীনতা। যখন সাংবাদিক সত্য প্রকাশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন, সেটিও পরাধীনতা। যখন সাংস্কৃতিক কর্মী নিজের শিল্পের কারণে আতঙ্কিত হন, সেটিও পরাধীনতা।
যখন একজন নাগরিক তার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিজের দেশেই নিরাপত্তাহীন বোধ করেন, সেটিও পরাধীনতা। যখন ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করা অপরাধ হয়ে ওঠে, সেটিও পরাধীনতা। শিকল সবসময় লোহার হয় না। কখনো শিকল তৈরি হয় ভয় দিয়ে । কখনো ঘৃণা দিয়ে। কখনো মিথ্যা দিয়ে। কখনো নীরবতা দিয়ে। সবচেয়ে ভয়ংকর পরাধীনতা হলো, যখন মানুষ নিজের স্বাধীনতাকেই আর প্রশ্ন করতে পারে না।
৫ আগস্টকে স্মরণ করার অর্থ প্রতিশোধের রাজনীতি নয়। প্রতিশোধ কোনো মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনে না। কোনো মায়ের বুকের শূন্যতা পূরণ করে না। কোনো শিশুর হারানো শৈশব ফিরিয়ে দেয় না।
আমাদের প্রয়োজন বিচার, প্রতিশোধ নয়। স্মৃতি, ঘৃণা নয়। সত্য, প্রচারণা নয়। মানবিকতা, রাজনৈতিক উন্মাদনা নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কতজন শত্রুকে পরাজিত করেছে তাতে নয়; বরং সে তার নাগরিকের কতটা মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছে, তাতে।
কেন ‘বাংলাদেশের পতন দিবস’?
আমি জানি, এই শব্দযুগল বিতর্ক তৈরি করবে। বিতর্ক হওয়াই উচিত। কারণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নীরবতার মধ্যে জন্ম নেয় না। আমি ৫ আগস্টকে ‘বাংলাদেশের পতন দিবস’ বলছি কোনো রাজনৈতিক দলের পতনকে বাংলাদেশের পতন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়।
বরং ঠিক বিপরীত কারণে। একটি দল রাষ্ট্র নয়, একটি সরকার বাংলাদেশ নয়। একটি রাজনৈতিক পরাজয়ও বাংলাদেশের পরাজয় নয়।
কিন্তু যেদিন রাজনৈতিক সংঘাত মানুষের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নৈতিকতা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, নাগরিক মর্যাদা ও সামাজিক সহাবস্থানের ওপর গভীর আঘাত হানে, সেদিন সেই ঘটনাকে কেবল ‘সরকার পরিবর্তন’ বলে ছোট করে দেখা যায় না।
সেদিন রাষ্ট্রের কিছু মৌলিক মূল্যবোধের পতন ঘটে। সেই অর্থেই— ৫ আগস্ট : বাংলাদেশের পতন দিবস।
একদিন আমরা কেউ থাকব না। আমাদের মতের, পছন্দের দল থাকবে না। আমাদের ক্ষমতা থাকবে না । আমাদের ব্যক্তিগত অহংকার থাকবে না। থাকবে শুধু ইতিহাস।
সেই ইতিহাস একদিন আমাদের জিজ্ঞেস করবে— ৫ আগস্টে কে জিতেছিল? কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হবে-সেদিন বাংলাদেশ কতটা বেঁচে ছিল?
কতজন মানুষ মারা গিয়েছিল? কতজন নারী, শিশু ও বৃদ্ধ আতঙ্কে দিন কাটিয়েছিল? কতজন সাংবাদিক নীরব হয়েছিল? কতজন সাংস্কৃতিক কর্মী ভয় পেয়েছিল? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কতটা আহত হয়েছিল? কতটা নাগরিক আস্থা ভেঙে পড়েছিল? কতটা রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশ কি সেদিন তার আত্মার কিছু অংশ হারিয়েছিল?
জানি এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। হয়তো ইতিহাসই একদিন তার উত্তর দেবে। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব প্রশ্নটি বাঁচিয়ে রাখা। কারণ যে জাতি প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে একদিন নিজের ইতিহাসও ভুলে যায়।
তাই ৫ আগস্টকে আমি শুধু একটি রাজনৈতিক তারিখ হিসেবে দেখতে চাই না। আমি চাই, এটি হয়ে উঠুক জাতীয় আত্মসমীক্ষার দিন। যেদিন আমরা নিহতের দলীয় পরিচয় নয়, মানুষের পরিচয় স্মরণ করব।
যেদিন শহীদের সংখ্যা নয়, প্রতিটি শহীদের জীবনকে স্মরণ করব। যেদিন বীরাঙ্গনার প্রতি করুণা নয়, সম্মান জানাব। যেদিন সংস্কৃতির ওপর আঘাতকে রাষ্ট্রের ওপর আঘাত হিসেবে বুঝব। যেদিন সাংবাদিকের স্বাধীনতাকে নিজের স্বাধীনতা বলে মনে করব। যেদিন ধর্মকে বিভেদের অস্ত্র নয়, মানুষের নৈতিক শক্তি হিসেবে দেখতে শিখব।
এবং যেদিন বুঝব— বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি, কোনো দল, কোনো সরকার বা কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের নাম নয়। বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাসের নাম। একটি ভাষার নাম। একটি মুক্তিযুদ্ধের নাম। ত্রিশ লাখ শহীদের নাম। বীরাঙ্গনার অশ্রুর নাম। একটি পতাকার নাম। এবং সর্বোপরি মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারটির নাম বাংলাদেশ।
৫ আগস্ট সেই অধিকার, সেই স্মৃতি, সেই মূল্যবোধ এবং সেই রাষ্ট্রচেতনাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাই ৫ আগস্টকে আমরা ভুলব না। প্রতিশোধের জন্য নয়। ঘৃণার জন্য নয়। সত্যকে জানার জন্য। ইতিহাসকে বোঝার জন্য। নিজেদের বিচার করার জন্য। এবং একদিন আরও মানবিক, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য।
৫ আগস্ট—বাংলাদেশের পতন দিবস।
ইতিহাসের কাছে এই উচ্চারণ কোনো শেষ কথা নয়। বরং একটি প্রশ্নের শুরু।
— এফ. এম. শাহীন || লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক
Email— fmshahin71@gmail.com