
ছামির মাহমুদ
আজ ১৫ই আগস্ট—স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাৎবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস। বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে এটি অন্যতম গভীর শোকাবহ ও স্মরণীয় একটি দিন। কিন্তু অত্যন্ত পরিাপের বিষয় হলো, দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই ঐতিহাসিক দিনটির সংবাদ কাভারেজ দেখে যেকোনো সচেতন নাগরিকের মতোই লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ হতে হয়।
অনেক গণমাধ্যমেই দিনটি নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সংবাদ চোখে পড়েনি। আর যেসব প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে খবর প্রকাশ করেছে, সেখানেও বঙ্গবন্ধুকে ন্যূনতম যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয়নি। অথচ এই একই গণমাধ্যমগুলোকে মাত্র কয়েক বছর আগেও চরম চাটুকারিতায় লিপ্ত থাকতে দেখেছি। ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সংবাদমাধ্যমের এই রূপবদল ও চাটুকারিতার অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। অন্যদিকে, একই দিনে নির্দিষ্ট কিছু অপ্রাসঙ্গিক ও বিতর্কিত একটি জন্মদিনের সংবাদ দিয়ে মিডিয়া ভরপুর রাখা হয়েছে, যা অপসাংবাদিকতারই স্পষ্ট প্রতিফলন। এমন অপসাংবাদিকতা এবং সুবিধাবাদী আচরণের অবসান ঘটা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা তার নিজস্ব বস্তুনিষ্ঠতা ও স্বমহিমায় ফিরে আসুক। ক্ষমতার সামনে মাথা নত করা নয়, বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সাহসিকতা অর্জন করা, সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলাই একজন নিরপেক্ষ সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব। কারণ, বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতাই পারে একটি দেশের টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী হাতিয়ার হতে।
শেখ মুজিবুর রহমান একদিনে তো আর ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠেননি। বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, ত্যাগ এবং জেল-জুলুম সহ্য করেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এদেশের অবিসংবাদিত নেতা ও মুক্তির প্রতীক। তাঁরই শক্ত নেতৃত্বে পরাধীনতার শিকল ছিঁড়ে বাঙালি অর্জন করেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ ও লাল-সবুজের পতাকা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, যে মহানায়ক আমাদের একটি স্বাধীন পরিচয় ও ভূখণ্ড উপহার দিলেন, আজ স্বদেশের গণমাধ্যম ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর প্রতি এক ধরণের দ্বিচারিতা ও উদাসীনতা দেখা যায়। যে স্বাধীন ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আজ এই চর্চা হচ্ছে, সেখানে জাতির ইতিহাস ও তাঁর অবদানকে প্রাপ্য সম্মান না দেওয়া আমাদের সংকীর্ণতারই বহিঃপ্রকাশ। যেখানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নামকরা গণমাধ্যম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে তাঁর নেতৃত্বকে বিশ্বমঞ্চে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে, সেখানে আমাদের এই আত্মবিস্মৃতি অত্যন্ত বেদনার। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা ক্ষমতার রদবদল যা-ই থাক না কেন, তারা তাদের জাতির জনককে দলমত নির্বিশেষে সম্মান জানাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু আমরা কিসের ভয়ে বা কোন মোহে পড়ে ইতিহাস ও ইতিহাসের মহানায়ককে অস্বীকার করছি? নোংরা রাজনীতির চর্চা কি আমাদের এতটাই অন্ধ ও কদর্য করে ফেলেছে যে, নিজের দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারীকেই সম্মান জানাতে পারছি না? দিনশেষে এই অকৃতজ্ঞতা ও ইতিহাস বিকৃতির খেসারত আমাদেরকেই দিতে হচ্ছে—বিশ্ব দরবারে আমরা নিজেদের এক চরম নিমকহারাম ও ইতিহাসবিচ্ছিন্ন জাতি হিসেবেই উপস্থাপন করছি।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনাসদস্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তাঁকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। সংঘটিত হয় ইতিহাসের ঘৃণ্য ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও ওই রাতে তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল; পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল; শেখ মুজিবুর রহমানের একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তাঁর জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা সেনা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল, এসবির কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান ও সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হককে হত্যা করা হয়।১৫ আগস্টের সেই রাতে সেনাসদস্যদের আরেকটি দল শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগনে তৎকালীন যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনির বাসায় হামলা চালিয়ে তাঁকে ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে হত্যা করে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে তাঁকে ও তাঁর কন্যা বেবি, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় আবদুল নঈম খানকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। পরে উচ্চ আদালত ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। এখন পর্যন্ত ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। একজন বিদেশে মারা গেছে। পাঁচজন এখনো পলাতক। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। এরপর থেকে দিনটি স্মরণে জাতীয় শোক দিবস পালিত হয়ে আসছে।
২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের পতন হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর শাহদাৎবার্ষিকীতে জাতীয় শোক দিবসে এখন আর সরকারি ছুটি নেই। গত বছর এই ছুটি বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে স্বাধীনতা বিরোধীরা অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করে। এর ছয় মাস পর দ্বিতীয়বার তৎকালীন মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তবর্তীকালিন সরকারের নিরব সহায়তায় ওই গোষ্ঠীটি আবারও হামলা চালিয়ে ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে ফেলে।
শোকাবহ এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৫ই আগস্টের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসা।
ছামির মাহমুদ, যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক
samir.sylhet@gmail.com