শৈলেন কুমার দাশ
প্রিয় লিওনেল মেসি হয়তো আপনার শেষ বিশ্বকাপের ম্যাচ এটি! তবে বিদায়টা এমন হবে সত্যিই আমরা ভাবতে পারিনি। আপনার দোষ কি, আজ গোটা আর্জেন্টিনা দলটি তাঁদের স্বাভাবিক খেলাটি খেলতে পারেনি! ফিরতে পারেনি তাদের চিরচেনা ফুটবলের নান্দনিক শিল্পকর্মে!
আর পারবেইবা কিভাবে, যেভাবে একচোখা রেফারি আর্জেন্টিনাকে ৫টি হলুদ কার্ড এবং ২টি লাল কার্ড দিয়েছে! এর পর কি করে একটি দল তার স্বাভাবিক খেলা খেলে? রেফারি সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে লাল কার্ডটি দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে হারানোর জন্য।
প্রথম থেকেই তার রেফারিং এর নমুনায় বুঝা গেছে সে যেন আর্জেন্টিনাকে হারানোর জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে মাঠে নেমেছে। তার আচরণ দেখে আমি প্রথমেই মনে মনে ভাবছিলাম ফুটবলের নান্দনিক সৌন্দর্য্যে সাজানো একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল মেস দেখা থেকে বঞ্চিত হবে আজ গোটা বিশ্ববাসী! আর সত্যি সত্যি তাই হল।
অনেকেই এই রেফারির একচোখা আচরণ দেখে বলেছেন সে হয়তো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঘুষ নিয়েছে স্পেনের নিকট থেকে বা স্বয়ং ফিফা তাকে আর্জেন্টিনাকে যেনতেনভাবে হারানোর মিশন দিয়েই মাঠে নামিয়েছে। পরে দ্বিতীয়টি ভাবনাটিই সত্য বলে ধরে দিয়েছে বিশ্ববাসীর মন। কারণ ফিফা যখন ‘গোল্ডেন বলটি’ গোটা এই বিশ্বকাপ আসরকে ফুটবলের অপার নান্দনিক সৌন্দর্য্যে যিনি সাজিয়েছেন সেই মেসিকে না দিয়ে স্পেনের আনখোরা মিডফিল্ডার রুদ্রিকে দিয়েছে, যে কিনা গোটা আসর জুড়ে একটিও গোল করেনি।
তার খেলার মধ্যে গায়ের জোরে দৌড়ানো ছাড়া ফুটবলের নান্দনিক শিল্পকর্মের কোন ছোঁয়া নেই! এসব বুঝা ফিফার আমলাতান্ত্রিক ও নির্দিষ্ট অঞ্চলকেন্দ্রিক মানসিকতা সম্পন্ন কর্মকর্তাদের অন্ধ পরিসরের অনেক দূরে। সত্যি বিশ্বব্যাপী সর্বক্ষেত্রে আজ সুশীল, সুন্দর ও নিরপেক্ষ চিন্তার খরা চলছে। ভাবছিলাম ফুটবল আসরটি এ থেকে দূরে? কিন্তু আজ ফাইনাল মেসের খেলা পরিচালনা দেখে আমার সেই ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হল।
এই মানসিকতার পরিবর্তন ও নিরপেক্ষ সরল সৌন্দর্য্যের আবরণে সজ্জিত না হলে একদিন হয়তো এই আসরে অনেক দেশই ঘৃণা আর তিরস্কারের সাথে পা রাখবে না। বা পাশাপাশি জন্ম নিতে পারে ফুটবল শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিরপেক্ষ ফুটবল বিচার ও বিচক্ষণতা শৈলী মহাদেশীয়, আন্তঃমহাদেশীয় এমনকি বৈশ্বিক ফুটবল সংস্হার। যারা ফুটবলের কালো অধ্যায় দূর করে নিরপেক্ষ ফুটবল শৈলী ও রেফারিং এর অলংকারে সাজাবে বিশ্ব ফুটবল আসরকে!
কোনকিছুই অসম্ভব নয়! সময় তার নিজস্ব নিরপেক্ষ অবস্হান আপন অলংকারে সাজাতে নিজেই সব পুরানো কালো অধ্যায় পরিহার করে জ্যোতিস্নাত হয় নবীন আলোর ধারায়। মনে হয় এখন সময় এসেছে ফিফার অত্যচার, অনিয়মের একচ্ছত্র ঘৃণ্য আধিপত্য থেকে বিশ্ব ফুটবলকে মুক্তি দিতে। ফিফার এই বিমাতা সুলভ আচরণের বার বারই বলি হয় আর্জেন্টিনার মত অর্থনৈতিকভাবে দ্বিতীয় সাড়িতে থাকা দেশগুলো।
দু’দলের খেলায় একদল তো হারবেই। এটাই তো ফুটবলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য্যে! কিন্তু এই ঘৃণ্য অনিয়ম আর পক্ষপাতিত্ব কেন? যা সত্যি আজ ফিফার মেস পরিচালনার আচরণ নিয়ে গোটা বিশ্ববাসীর মনে নানাবিধ মলিন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে?
এ রকম ফাইনাল খেলায় কোন টিমকে লাল কার্ড দেয়া মানে ঐ টিমকে হারানোর জন্য দেয়া! লাল কার্ড দেয়া হয় কখন? যখন কোন খেলোয়ার মারাত্মক কোন ফাউল করে? রেফারির যুক্তি হয়তো এক্ষেত্রে আর্জেন্টাই মিড ফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ দু’টি হলুদ কার্ডের জন্য লাল কার্ড পেয়েছেন। আসলেই কি ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ডটি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন? এরচেয়ে তো স্পেনিসরা মারাত্মক দু’টি ফাউল করেছিল মেসির উপর। সেখানে তো লাল কার্ড দেয়া দূরের কথা হলুদ কার্ডও দেয়নি কানা রেফারি! এটি খুবই পরিস্কার যে রেফারিকে মাঠে পাঠানো হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করার মিশন দিয়ে। যা সত্যি ফিফার জন্য কলংক, ফুটবলের জন্য কলংক এবং বিশ্বকাপ ২০২৬ এর জন্য কলংক।
আরো একটু বিস্তারিত বললে আর্জেন্টিনাকে হারানোর বিষয়টি যে রেফারি/ফিফার পূর্ব পরিকল্পিত তা বুঝা যাবে! এই মেসে রেফারি আর্জেন্টিনার ফাউল ধরেছে ২৪টি আর স্পেনের ২১টি (মূলতঃ স্পেনের ফাউল ছিল আরো বেশি ২৯টির মত)। কিন্তু রেফারি স্পেনকে একটিও হলুদ কার্ড দেয়নি অথচ আর্জেন্টিনাকে দিয়েছে ৫টি হলুদ কার্ড ও ২টি লাল কার্ড (খেলা শেষ হওয়ার পর ১)? মেসিকে দু’বার স্পেনিসরা মারাত্মক ফাউল করেছে কিন্তু রেফারি কোন হলুদ কার্ড দেয়নি!
অথচ যে গ্ৰাউন্ডে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত মিড ফিল্ডারকে লাল কার্ড দিল, মেসিকেও মারাত্মকভাবে ফাউলের জন্য স্পেনিসদের অন্ততঃ একটা লাল কার্ড প্রাপ্য ছিল।
কানা, একচোখা রেফারি এ ক্ষেত্রে হলুদ কার্ড পর্যন্ত দেয়নি। স্পেনিসরা মেসিকে এমন মারাত্মকভাবে ট্যাকল করার বডি লেংগুয়েজ প্রদর্শন বা অনিয়ন্ত্রিত আক্রমণ করেছে ফলে মেসি বল ধরতেই পারেননি। অর্থাৎ বল ধরতে গেলেই মেসির উপর অনিয়ন্ত্রিত আক্রমণ। রেফারির পক্ষ থেকে এ অবস্হা উত্তরণের কোন প্রচেষ্টা চোখে পড়েনি।
মেসির মত বিশ্বের প্রথম সাড়ির ফুটবলারদের গায়ে স্পর্শ করলেই ফাউল এমনকি হলুদ কার্ড দেয়া হয় সাধারণতঃ যাতে মেসিরা ফুটবলে শৈল্পিক নৈপূণ্য প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু এই ফাইনাল মেসে রেফারির আচরণ যা সত্যি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং মারাত্মকভাবে ফুটবলের এবং বিশ্বকাপের সৌন্দর্য্যকে ধুলুণ্ঠিত করেছে। আবারও বলছি এর ফলে এমন অবস্হা সৃষ্টি হতে পারে আগামীতে, অনেক দেশই হয়তো কলংকিত এই বিশ্বকাপ আসরে পা বাড়াবে না!
বিশ্বকাপ আসরকে ফুটবল শিল্পের অসাধারণ নৈপূণ্য দিয়ে দেদীপ্যমান আলোর ধারায় প্রথম থেকে শেষ অবধি যিনি দু’হাতে সাজিয়ে দিয়েছেন তিনি হচ্ছেন মেসি। শিল্পীর নিপূণ তুলির নিখুঁত রং ছড়ানোর মতই করেছেন ৮টি নান্দনিক গোল! যা দেখলে সময় যেন থমকে যায় ক্ষণকালের জন্য! চক্ষু যেন স্হির হয়ে যায় বাতাসে ভেসে ভেসে বলের গোলের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অতিক্রমের সময়ের অপার সৌন্দর্য্যে!
আর সার্থক এক শিল্পীর রং জড়ানো নান্দনিক তুলির আঁচরের মত বার বার সাজিয়ে দিয়েছেন সতীর্থদের খেলার আসর। যা বিশ্বব্যাপী ফুটবল প্রেমীদের নয়নকোণে স্হান করে নিয়েছে ম্যাজিকের মত! এর পরও যখন মেসিকে ‘গোল্ডেন বল’ না দিয়ে অন্য কাউকে দেয়া হয় ‘গোল্ডেন বল’ তখন ফিফার দুরভিসন্ধি আর বুঝতে কি বাকি থাকে? তাতে কি এটি বুঝতে সহজ হয়না যে মেসি ও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে পরাজিত করার মিশন ছিল স্বয়ং ফিফার! ছি ছি ও ধিক্কার এই একচোখা, কানা ও অনিরপেক্ষ ফিফাকে।
ফুটবলের অমিয় সুন্দর, নান্দনিক শিল্পের উৎকর্ষ বিধানে নিরপেক্ষ বিচারবোধের উজ্জল আবিরে সজ্জিত হতে পারলে এই ফিফা টিকে থাকুক, তা না হলে থেমে যাক এ পথ, জন্ম নিক এক সম্পূর্ণ সুন্দর, সুশীল ও নিরপেক্ষ এক আগামী বিশ্ব ফুটবল সংস্হার!
পরিশেষে প্রিয় মেসিকে বলবো এই একটি ম্যাচ কখনোই আপনার মতন একজন ফুটবল কিংবদন্তির পরিচয় বদলে দিতে পারে না! বদলে দিতে পারে না বিশ্ব ফুটবল আসরের নান্দনিক এক জাদুকরের পায়ের জাদুতে সাজানো এক শিল্পের রংগিন দিগন্তরেখা। অসীম সৃষ্টি ও স্মৃতিময় ফুটবলের বর্নাঢ্য পথরেখা!
এক জীবনে সবকিছু পাওয়া যায় না ভেবে শান্তনা খুঁজবেন মনে। আর মাপ করে দিবেন তাদেরকে যারা আপনার পরাজয়ের এমন পথরেখা সাজিয়েছে ঘৃণ্য পরিকল্পনায়! তারপরও আপনি সবাইকে ছাপিয়ে ফুটবল গগনে এক বিষ্ময়কর উজ্জল নক্ষত্র, এই শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবলার, কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসা বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে।
আজ হয়তো আপনার চোখে কষ্টের জল; হতে পারতো আনন্দের অশ্রু! হয়নি কেন তাই ছিল আজকের আলোচনার উপজীব্য বিষয়! কিন্তু ফুটবলকে আপনি যা দিয়েছেন, এই অঙ্গনে দু’হাতে যে রং ছড়িয়েছেন তা ইতিহাস কখনো ভুলবে না। আপনার দু’পায়ের অকল্পনিয় জাদু, আপনার জয়োদীপ্ত লড়াই, আপনার বিনম্র বিনয়, সতীর্থদের প্রবল মনোবলে সাজিয়ে দেয়ার শক্তি …. এসবই আপনাকে অমর করে রাখবে বিশ্বময় শুধু ফুটবল আসর নয়; মানুষের আসরে! আপনার নাম, প্রজন্মের পর প্রজন্মে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও অনুরাগে উচ্চারিত হবে বিশ্বব্যাপী কোটি মানুষের প্রাণে!