আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আদালতের সাবেক বিচারপতি নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের খবর সামনে আসে। এতে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কঠোর সমালোচনা করে আইসিসি বলেছে, এই পদক্ষেপ আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মৌলিক ভিত্তির ওপর বড় আঘাত। আদালতকে রক্ষায় বিশ্বের ১২৫টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা শুধু একটি সংস্থাকে রক্ষার বিষয় নয়; বরং আইনের শাসনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো মার্কিন নাগরিকের বিচার আইসিসির মাধ্যমে হতে দেবেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আদালটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেন নিষিদ্ধ করবে, এর সম্পদ জব্দ করবে এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত করবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের রেয়াত সুবিধাসহ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। তবে টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন প্রদান এবং বন্দিদের সঙ্গে সম্পর্কিত লেনদেনের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে আংশিক ছাড় রাখা হয়েছে।
রুবিও জানান, আইসিসি ও এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান করার সুযোগ দিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের শর্ত পূরণ না হলে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আইসিসির ওপর ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র।
আদালতের ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামিম খান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে বলেছেন, এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করা। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আদালত সব পরিস্থিতিতে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসনের অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত হয়। আদালতটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধ এবং নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে অন্য কিছু পরিস্থিতিতেও বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে। তবে আদালতের এখতিয়ার সর্বজনীন নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র রোম সংবিধির সদস্যরাষ্ট্র নয়।
আইসিসি অতীতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সুদানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। আদালতের বিচারিক পদক্ষেপ ও এর এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধও তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনবিদ নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কারের খবর পাওয়া যায়। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল চেম্বারের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চেয়েছেন আইসিসির নিবন্ধক অসভালদো জাবালা গিলার। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তাদের ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো, ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট বিদেশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
এদিকে মার্কো রুবিও আইসিসির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আদালতকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র আদালটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারে।
রুবিও আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের অনেকেই আইসিসির সদস্য এবং তাদের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তাই আদালতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে মিত্রদের ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, আদালতের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করে, তার ওপর এই বিরোধের পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সূত্রঃ রয়টার্স