Skip to main content

Brick Lane News

যুক্তরাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগ:

যুক্তরাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগ:

বাংলাদেশি শিক্ষার্থী-কর্মীদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ

লন্ডন: যুক্তরাজ্যে নতুন জীবন শুরু করতে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগের কারণে গুরুতর আইনি ঝুঁকিতে পড়ছেন কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মী। বয়স নিয়ে ভুল তথ্য, যৌনধর্মী কথোপকথন, ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান কিংবা অনলাইনে পরিচয়ের পর সরাসরি দেখা করার উদ্যোগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশি তদন্ত ও ফৌজদারি মামলার কারণ হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাজ্যে কথিত ‘স্টিং অপারেশন’ ও তরুণীদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে পুরুষদের আটকের বিভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিও বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো ভিডিও বা অভিযোগকে আদালতের রায় হিসেবে দেখা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন কি না, সেটি তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

১৬ বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে আইন কঠোর

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সাধারণভাবে যৌন সম্মতির বয়স ১৬ বছর। তবে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সঙ্গে যৌন উদ্দেশ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আইন অত্যন্ত কঠোর।

ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের (CPS) নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী কোনো ব্যক্তি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সঙ্গে যৌন যোগাযোগ করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটি ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে। এ ধরনের যোগাযোগ শুধু সামনাসামনি হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইন চ্যাট, মেসেজ, ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদানও তদন্তের অংশ হতে পারে।

Sexual Offences Act 2003-এর Section 15-এ শিশুকে যৌন উদ্দেশ্যে ‘grooming’ করার পর তার সঙ্গে দেখা করা বা দেখা করার ব্যবস্থা করার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

‘শুধু চ্যাট করেছি’ বলেও দায় এড়ানো কঠিন

বাংলাদেশ থেকে নতুন করে যুক্তরাজ্যে আসা অনেকের কাছে দেশটির শিশু সুরক্ষা ও যৌন অপরাধসংক্রান্ত আইন পুরোপুরি পরিচিত নাও হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও বয়স ১৮, ১৯ বা তার বেশি উল্লেখ থাকলেও পরে বয়স নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

তাই ‘শুধু চ্যাট করেছি’, ‘শুধু ছবি পাঠিয়েছি’ কিংবা ‘শুধু দেখা করার কথা হয়েছিল’ এমন ব্যাখ্যা সব পরিস্থিতিতে আইনি দায় থেকে মুক্তি দেয় না। বিশেষ করে কথোপকথনের উদ্দেশ্য, পাঠানো বার্তা, ছবি বা ভিডিও এবং পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর তদন্তের গুরুত্ব নির্ভর করতে পারে।

CPS-এর নির্দেশনায় শিশুদের অনলাইনে grooming এবং যৌন উদ্দেশ্যে যোগাযোগকে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অনলাইন যোগাযোগের পর সরাসরি দেখা করার উদ্যোগ নিলে বিষয়টি আরও গুরুতর আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ভুয়া পরিচয়ের মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে CPS জানায়, ৪৮ বছর বয়সী রুহেল মিয়া Snapchat-এ নিজেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিন কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

CPS-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পর কথোপকথন যৌন দিকে নিয়ে যান এবং পরে তাদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করেন। ১৫টি child sexual abuse-সংক্রান্ত অভিযোগে দোষ স্বীকার করার পর ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ Wolverhampton Crown Court তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

মামলাটি দেখিয়ে দেয়, অনলাইনে ভুয়া বয়স বা পরিচয় ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরে সাক্ষাতের চেষ্টা যুক্তরাজ্যে কতটা গুরুতরভাবে নেওয়া হয়।

বছরে এক লাখের বেশি অভিযোগ

যুক্তরাজ্যে অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। National Crime Agency (NCA) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে পুলিশের কাছে শিশু যৌন নির্যাতনের ১ লাখ ৪ হাজার ২৬৬টি অপরাধ রিপোর্ট করা হয়েছে।

NCA ও National Police Chiefs’ Council (NPCC) জানিয়েছে, শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনায় যুক্তরাজ্যে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১,০০০ সম্ভাব্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং প্রায় ১,২০০ শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।

তবে এসব পরিসংখ্যান অভিযোগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমের তথ্য। প্রতিটি অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়।

বিদেশি নাগরিকদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি

বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, কেয়ার কর্মী বা অন্য কোনো বিদেশি নাগরিক যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে বিষয়টি শুধু আদালতের সাজায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। অপরাধের ধরন ও সাজাসহ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার ভিসা, থাকার অনুমতি কিংবা ভবিষ্যৎ অভিবাসন অবস্থার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

Home Office-এর বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে deportation বা যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি প্রত্যাখ্যান বা বাতিলের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে। ১২ মাস বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে deportation-এর আইনি বিধান রয়েছে।

তবে কোনো অভিযোগ বা গ্রেপ্তার মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে deportation নয়। প্রতিটি ঘটনা তার নিজস্ব তথ্য ও আইনি পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা

যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে আসা বাংলাদেশিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। কারও বয়স নিয়ে সন্দেহ থাকলে যৌনধর্মী কথোপকথন, ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া বা পাঠানো কিংবা দেখা করার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকা উচিত।

বিশেষ করে অনলাইনে দেওয়া বয়সের তথ্যকে একমাত্র ভিত্তি ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে যোগাযোগ বন্ধ করা এবং কোনো পুলিশি তদন্ত বা অভিযোগের মুখোমুখি হলে দ্রুত একজন যোগ্য UK solicitor-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যুক্তরাজ্যে নতুন জীবন শুরু করা অনেক বাংলাদেশির কাছে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। কিন্তু অনলাইনে একটি ভুল সিদ্ধান্ত সেই স্বপ্নের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নতুন দেশে স্বাধীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার পাশাপাশি দেশটির আইন ও শিশু সুরক্ষার নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখাও জরুরি।