সুশান্ত দাস গুপ্ত, ব্রিকলেন, লন্ডন:
২০২৬ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার নারী আইনজীবী ও বিচারক নাভি পিল্লাই। আজ, ৯ অক্টোবর তার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করার কাজে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য। সহজ কথায়, অত্যাচারী যত ক্ষমতাবানই হোক, তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কাজে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন।
বিষয়টা বুঝতে একটা গ্রামের কথা কল্পনা করুন। গ্রামের এক প্রভাবশালী লোক গরিবের জমি কেড়ে নেয়, প্রতিবাদ করলে মারধর করে। সবাই ভয় পেয়ে চুপ থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, গ্রামে কোনো ঝামেলা নেই। অথচ মানুষ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। এবার কেউ সেই নির্যাতিত মানুষের কথা শুনলেন, প্রমাণ সংগ্রহ করলেন, আদালতে বিচার পাওয়ার পথ তৈরি করলেন।
অপরাধীর শাস্তি হলো। অন্য অত্যাচারীরাও বুঝল, অন্যায় করলে জবাব দিতে হবে। এতে মানুষের নিরাপদে বাঁচার সুযোগ বাড়ে। নাভি পিল্লাইয়ের কাজের গুরুত্ব অনেকটা এভাবে বোঝা যায়।
তার নিজের দেশেও একসময় গায়ের রঙ দেখে মানুষের অধিকার নির্ধারণ করা হতো। কারও বেশি অধিকার, কারও কম। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, আইনজীবী হিসেবে তিনি তাদের পক্ষে কাজ করেছেন। কারাগারে নির্যাতন এবং বন্দিদের অধিকার নিয়েও লড়েছেন। পরে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হয়েছেন।
তার কাজের একটি বড় উদাহরণ আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা। সেখানে ১৯৯৪ সালে একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল। নারীদের ওপরও চালানো হয়েছিল ধর্ষণ ও নির্যাতন। এসব অপরাধের বিচারে নাভি পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৮ সালের এক ঐতিহাসিক রায়ের বিচারকদের একজন ছিলেন তিনি। সেই রায়ে বোঝানো হয়, কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ধর্ষণ চালানো হলে সেটিও গণহত্যার অংশ হতে পারে। ওই মামলায় অপরাধী এক স্থানীয় শাসককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত আরেকটি বিষয় হলো রোহিঙ্গাদের দুর্দশা।রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যে মামলা চলছে, সেখানেও তিনি একজন বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মানুষের ওপর ভয়াবহ অত্যাচারের বিচার এবং রাষ্ট্র ও নেতাদের আইনের কাছে জবাব দিতে বাধ্য করার কাজে তার দীর্ঘ অবদানকে নোবেল কমিটি সম্মান জানিয়েছে।
একজন চাষি নিজের জমিতে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন, একজন মা সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে পারবেন, অত্যাচারের শিকার মানুষ বিচার চাইতে পারবেন। এমন জীবন গড়তে অন্যায়ের বিচার দরকার। অপরাধ করে বারবার পার পেয়ে গেলে অত্যাচারীর সাহস বাড়ে। বিচার হলে মানুষের মনে ভরসা জন্মায়। নাভি পিল্লাই সেই ভরসা তৈরির কাজ করেছেন। নোবেল কমিটিও এবারের ঘোষণায় বলেছে, স্থায়ী শান্তি গড়তে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রয়োজন।