Skip to main content

Brick Lane News

চোখহীন ক্ষুদ্র শৈবাল থেকে মস্তিষ্কের রিমোট কন্ট্রোল: চিকিৎসায় নোবেলের চমকপ্রদ ইতিহাস

চোখহীন ক্ষুদ্র শৈবাল থেকে মস্তিষ্কের রিমোট কন্ট্রোল: চিকিৎসায় নোবেলের চমকপ্রদ ইতিহাস

সুশান্ত দাস গুপ্ত, ব্রিকলেন,  লন্ডন:
আপনাকে যদি বলি, বিজ্ঞানীরা এখন আলো জ্বালিয়ে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষকে ‘অন’ করতে পারেন, আবার আলো নিভিয়ে সেটাকে ‘অফ’ও করতে পারেন, বিশ্বাস করবেন?
শুনতে অনেকটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো। কিন্তু এই অসম্ভব মনে হওয়া কাজের পেছনের আবিষ্কারই এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল এনে দিয়েছে কার্ল ডাইসেরথ, পিটার হেগেমান এবং জর্জ নাগেলকে।
তাদের কাজের মূল বিষয়টির নাম অপটোজেনেটিক্স, সহজ বাংলায় বললে, আলো ব্যবহার করে জীবন্ত কোষের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা।
আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই গল্পের শুরু মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে নয়। শুরু হয়েছিল পানিতে থাকা একধরনের অতি ক্ষুদ্র সবুজ শৈবাল দিয়ে!
একটু কল্পনা করুন। পুকুরের পানিতে একটা ক্ষুদ্র শৈবাল ভেসে বেড়াচ্ছে। তার চোখ নেই, মস্তিষ্কও নেই। অথচ সে বুঝতে পারে আলো কোন দিক থেকে আসছে এবং সেই অনুযায়ী নড়াচড়া করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মাথায় প্রশ্ন এলো, চোখই যখন নেই, তাহলে আলো বুঝছে কীভাবে?
খুঁজতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করলেন, এই শৈবালের গায়ে বিশেষ ধরনের আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন আছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের নাম চ্যানেলরোডপসিন। সহজ করে ভাবুন, এটি শৈবালের কোষের গায়ে লাগানো একটা ছোট্ট দরজা।
সাধারণ অবস্থায় দরজাটি বন্ধ। কিন্তু আলো পড়লেই, খটাস! দরজা খুলে যায়।
তখন বৈদ্যুতিক চার্জ বহনকারী ক্ষুদ্র কণা কোষের ভেতরে ঢুকতে বা বের হতে পারে। ফলে কোষের ভেতরের বৈদ্যুতিক অবস্থাও বদলে যায়।
এবার বিজ্ঞানীদের মাথায় এলো আসল বুদ্ধিটা।
শৈবালের এই আলো দিয়ে চালানো দরজাটা যদি কোনো প্রাণীর মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে বসানো যায়, তাহলে কী হবে?
ব্যস, সেখান থেকেই শুরু নতুন অধ্যায়।
আমাদের মস্তিষ্কে কোটি কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরন আছে। কোনো স্নায়ুকোষ আমাদের হাত-পা নড়াতে সাহায্য করে, কোনোটি স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত, কোনোটি ভয়, আনন্দ, ক্ষুধা কিংবা ঘুমের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু এত কোটি কোষের ভিড়ে কোন কোষটি ঠিক কী করছে, সেটা বোঝা ছিল ভয়ানক কঠিন।
বিজ্ঞানীরা এবার শৈবালের সেই আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষে বসানোর কৌশল বের করলেন। এরপর সেই কোষের ওপর নির্দিষ্ট আলো ফেললে সেটিকে সক্রিয় করা যায়। আবার আলো সরিয়ে নিলে তার কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া যায়।
অর্থাৎ বিজ্ঞানীর হাতে যেন মস্তিষ্কের জন্য একটা রিমোট কন্ট্রোল চলে এলো!
ভাবুন, একটা ইঁদুর স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিজ্ঞানী তার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুকোষে আলো দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণ বদলে গেল। আলো বন্ধ করলেন, আচরণও আবার বদলে গেল।
এখন বিজ্ঞানী অনেক বেশি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন,
আচ্ছা! তাহলে মস্তিষ্কের এই কোষগুলো ওই বিশেষ আচরণের সঙ্গে জড়িত।
আগে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করা অনেকটা দূর থেকে রাতের ঢাকা শহর দেখার মতো ছিল। লাখ লাখ বাতি জ্বলছে, গাড়ি চলছে, মানুষ চলছে। আপনি বুঝতে পারছেন শহর কাজ করছে, কিন্তু কোন বাড়িতে ঠিক কী হচ্ছে, সেটা আলাদা করে জানা কঠিন।
অপটোজেনেটিক্স যেন বিজ্ঞানীদের সেই শহরের নির্দিষ্ট বাড়ির আলাদা আলাদা সুইচ ধরিয়ে দিয়েছে।
এর ফলে স্মৃতি কীভাবে তৈরি হয়, ভয় কোথা থেকে আসে, ঘুম কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, আমরা কেন নির্দিষ্ট আচরণ করি, এসব বোঝার নতুন দরজা খুলেছে। একই সঙ্গে পারকিনসন রোগ, মৃগীরোগ, আলঝেইমার রোগ এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো মস্তিষ্কের জটিল রোগগুলো আরও ভালোভাবে বোঝার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এখানে একটা ভুল ধারণা যেন না হয়। এই নোবেল কোনো নতুন ওষুধ আবিষ্কারের জন্য দেওয়া হয়নি। এমনও নয় যে আগামীকাল হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার মাথায় আলো ফেলেই পারকিনসন বা আলঝেইমার সারিয়ে দেবেন।
আসল আবিষ্কারটা আরও মৌলিক।
বিজ্ঞানীরা এমন একটি জৈবিক সুইচ পেয়েছেন, যার সাহায্যে জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর মস্তিষ্কের কোন কোষ কী করছে, সেটা যত ভালোভাবে জানা যাবে, ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের রোগের চিকিৎসার নতুন পথ বের হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
আর ভাবুন তো পুরো গল্পটার সৌন্দর্য কোথায়।
মানুষের মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল জিনিসগুলোর একটি। অথচ সেই মস্তিষ্কের রহস্যের দরজা খুলতে বিজ্ঞানীদের চাবিটা দিল কে?
পুকুরের পানিতে ভেসে থাকা চোখহীন, মস্তিষ্কহীন এক ক্ষুদ্র সবুজ শৈবাল!
এটাই বিজ্ঞানের মজা। প্রকৃতির কাছে কখন কোন প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে, আমরা আগে থেকে জানি না।
এবারের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেলকে তাই বলা যায় যে, একটি ক্ষুদ্র শৈবাল বিজ্ঞানীদের শিখিয়েছে কীভাবে আলোকে ‘সুইচ’ বানাতে হয়, আর সেই সুইচ দিয়েই এখন মানুষ মস্তিষ্কের রহস্যের একেকটি দরজা খুলছে।
আরও পড়ুন