ব্রিকলেন নিউজ, লন্ডন: ব্রিটেনে পুলিশের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় একটি নতুন নজরদারি সংস্থা গঠন এবং আইনি বিধিমালা তৈরি করবে সরকার।
ডেইলি মিররের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন নিয়মে পুলিশ কেবল তখনই বিতর্কিত ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবে, যখন তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকবে যে আশপাশে কোনো সন্দেহভাজন বা পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তি অবস্থান করছেন। অর্থাৎ নির্বিচারে মানুষের মুখ স্ক্যান করার সুযোগ সীমিত করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার পর ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রগতিগুলোর একটি। এই প্রযুক্তির সহায়তায় ইতোমধ্যে হাজার হাজার বিপজ্জনক অপরাধীকে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো থেকে আটকানো সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিটির সুফল স্পষ্ট হলেও এর ব্যবহার অবশ্যই ন্যায়সংগত, নিরাপদ ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিটির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
সরকার নতুন আইনের মাধ্যমে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহার গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর ও আনুপাতিক করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। পাশাপাশি দোকানসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কীভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ধারণে আলাদা আইনি বিধিমালা তৈরি করা হবে।
প্রযুক্তিটির কার্যকারিতার পক্ষে উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ লন্ডনের ক্রয়ডনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যামেরা ব্যবহারের সময় ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ধর্ষণ, অপহরণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিসহ ১৭৩ জন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ওই এলাকায় সামগ্রিক অপরাধের হার ১০ শতাংশ কমেছে।
এ ছাড়া এ বছরের নটিং হিল কার্নিভালে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ৮৬ জন নিবন্ধিত যৌন অপরাধীকে শনাক্ত করে থামানো হয়। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে প্রযুক্তিটির নির্ভুলতা ও বর্ণগত পক্ষপাত নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এক গবেষণায় কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের অন্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি শনাক্ত করার প্রবণতা পাওয়া যাওয়ার পর এসেক্স পুলিশ সাময়িকভাবে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরার ব্যবহার বন্ধ রাখে। পুলিশ জানিয়েছিল, ইতিবাচক শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য পক্ষপাতের বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে।
লেবার পার্টির এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি বলেছেন, গণতান্ত্রিক তদারকির তুলনায় ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির বিস্তার অনেক দ্রুত হয়েছে। এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তিনি কার্যকর সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট শাস্তির বিধান রাখার দাবি জানিয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন লিবার্টির পরিচালক আকিকো হার্ট বলেছেন, নতুন সুরক্ষাব্যবস্থা চালুর ঘোষণা ইতিবাচক হলেও আইন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ বন্ধ রাখা উচিত। তার অভিযোগ, লাখ লাখ মানুষের সম্মতি ছাড়াই তাদের মুখ স্ক্যান করা হয়েছে এবং বর্ণগত পক্ষপাতযুক্ত প্রযুক্তির কারণে ভুল শনাক্তকরণের শিকার হয়ে কেউ কেউ হয়রানির মুখেও পড়েছেন।
নতুন নজরদারি সংস্থাকে প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে আপত্তি থাকলে এর ব্যবহার বন্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হবে। ফলে পুলিশ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে মানুষের মুখ শনাক্তকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তার ওপর আরও কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হবে।