যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত চাকরির সুযোগ ও কর্মী চলাচলবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ৩ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শ্রমবাজারের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। এতে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে দেশটিতে চাকরির খালি পদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫ লাখ ২৩ হাজারে। আগস্ট মাসে সংশোধিত হিসাবে এই সংখ্যা ছিল ৭১ লাখ ৯০ হাজার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে চাকরির খালি পদ বেড়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে চাকরির খালি পদের হার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আগস্ট মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য অপেক্ষমাণ পদের সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে।
এই পরিসংখ্যানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেকার মানুষের তুলনায় চাকরির সুযোগের সংখ্যা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি একজন বেকার মানুষের বিপরীতে প্রায় ১ দশমিক ০৬টি খালি চাকরির পদ রয়েছে। আগস্ট মাসে এই অনুপাত ছিল প্রায় ১ দশমিক ০২। অর্থাৎ বেকার মানুষের তুলনায় চাকরির সুযোগ কিছুটা বেড়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক বেকার মানুষ সহজেই চাকরি পেয়ে যাবেন। কারণ চাকরির খালি পদ থাকা এবং বাস্তবে নিয়োগ পাওয়া দুটি আলাদা বিষয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মী প্রয়োজন হলেও দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অবস্থান এবং বেতনের প্রত্যাশার কারণে অনেক চাকরিপ্রার্থীর জন্য সেই পদে নিয়োগ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
নতুন প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর একটি হলো কর্মী ছাঁটাইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়া। সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী ছাঁটাই এবং চাকরি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার। আগস্ট মাসের সংশোধিত হিসাবে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৬৮ হাজার। অর্থাৎ এক মাসে ছাঁটাই কমেছে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার।
এটি ২০২৫ সালের মার্চ মাসের পর সর্বনিম্ন পর্যায়। কর্মী ছাঁটাই কমে যাওয়াকে শ্রমবাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই কম হলে সাধারণত বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় কর্মী কমানোর চাপ কিছুটা সামাল দিতে পারছে।
তবে ছাঁটাই কমে যাওয়া মানেই সব প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগ করছে, এমন নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নিচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে চাকরি ছেড়ে দেওয়া কর্মীর সংখ্যাও বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় প্রায় ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার কর্মী স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন। আগস্ট মাসে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ ৪৪ হাজার। অর্থাৎ এক মাসে চাকরি ছেড়ে দেওয়া কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার।
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার এই পরিসংখ্যান শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ কোনো কর্মী যখন নিজের সিদ্ধান্তে চাকরি ছেড়ে দেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে তার পেছনে নতুন চাকরির সম্ভাবনা, ভালো বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ কিংবা পেশাগত উন্নতির সুযোগ কাজ করতে পারে।
অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রবণতাকে শ্রমবাজারের আত্মবিশ্বাস বোঝার একটি সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে প্রত্যেক কর্মী যে ভালো বেতনের চাকরি পেয়ে বর্তমান প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন, তা এই পরিসংখ্যান থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। ব্যক্তিগত কারণ, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা অন্য কোনো সুযোগের কারণেও কর্মীরা চাকরি ছাড়তে পারেন।
শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মোট কর্মী নিয়োগের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪ লাখ ২ হাজার। আগস্ট মাসে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৫২ লাখ ৭১ হাজার। অর্থাৎ এক মাসে নতুন নিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বর মাসে মোট চাকরি ছেড়ে যাওয়া, ছাঁটাই হওয়া এবং অন্যান্য কারণে প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৩ লাখ ১৯ হাজার। আগস্ট মাসে সংশোধিত হিসাবে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মোট চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হিসাবের মধ্যে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়া, প্রতিষ্ঠান থেকে ছাঁটাই এবং অন্যান্য কারণে চাকরি শেষ হওয়ার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই শুধু ছাঁটাইয়ের সংখ্যা দিয়ে পুরো শ্রমবাজারের পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।
শিল্পভিত্তিক তথ্যেও কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আবাসন ও খাদ্যসেবা খাতে নতুন কর্মী নিয়োগ বেড়েছে। এই খাতে নিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার। একই খাতে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বোঝা যাচ্ছে, শ্রমবাজারের পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন শিল্পের আলাদা ভূমিকা রয়েছে।
নির্মাণ, উৎপাদন এবং ব্যবসায়িক সেবাসহ বিভিন্ন খাতেও চাকরির খালি পদের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি নতুন প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সব খাতেই একই ধরনের উন্নতি হয়নি। কিছু খাতে চাকরির সুযোগ কমেছে কিংবা নিয়োগের গতি স্থির রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও এই প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন। কেউ রেস্তোরাঁ, হোটেল, পরিবহন, নির্মাণ, দোকানপাট কিংবা গুদামে কাজ করছেন। আবার অনেকে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও পেশাগত সেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
চাকরির খালি পদ বাড়লে এসব খাতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যারা বর্তমানে চাকরিহীন রয়েছেন অথবা কম বেতনের চাকরিতে কাজ করছেন, তারা নতুন সুযোগ খুঁজে দেখতে পারেন।
তবে চাকরির খালি পদ বাড়ার খবর শুনে বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। কারণ চাকরির বিজ্ঞাপন থাকলেই নিয়োগ নিশ্চিত হয় না। অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন পদ খালি রাখে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেও শেষ পর্যন্ত কর্মী নেয় না।
অভিবাসী কর্মীদের ক্ষেত্রে বৈধ কাজের অনুমতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা এবং নিয়োগকর্তার শর্ত পূরণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ভিসায় থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের অনুমতি ও নির্ধারিত নিয়ম মেনে চাকরি করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এই পরিসংখ্যানের গুরুত্ব রয়েছে। শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকলে মানুষের আয় এবং ভোগব্যয় স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি কর্মী নিয়োগ করলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে চাকরির বাজারের উন্নতির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক ব্যয় এবং সুদের হারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির তথ্য বিবেচনা করেই সুদের হার নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়। শ্রমবাজার অতিরিক্ত শক্তিশালী হলে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আবার কর্মসংস্থান দুর্বল হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে নতুন প্রতিবেদনের পরও অর্থনীতিবিদেরা শুধু চাকরির খালি পদের সংখ্যা দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছেন না। নিয়োগের গতি, বেকারত্বের হার, কর্মীদের বেতন এবং নতুন চাকরি সৃষ্টির পরিসংখ্যানও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে আগামী ৬ নভেম্বর শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের অক্টোবর মাসের পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে। এই প্রতিবেদনে অক্টোবর মাসে কতজন নতুন চাকরি পেয়েছেন, বেকারত্বের হার কত ছিল এবং বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের কী পরিবর্তন হয়েছে, তা জানা যাবে।
এর আগে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানবিষয়ক একটি প্রতিবেদনে অক্টোবর মাসে ৮৬ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জরিপভিত্তিক হিসাব। সরকারি কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের সঙ্গে এর হিসাব ও পদ্ধতি এক নয়। তাই ৬ নভেম্বরের সরকারি প্রতিবেদনের ফলাফল আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে।