Skip to main content

Brick Lane News

অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়: রাজশাহীতে ছেলের সঙ্গে এসএসসি-তে জিপিএ-৫ পেলেন মা

অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়: রাজশাহীতে ছেলের সঙ্গে এসএসসি-তে জিপিএ-৫ পেলেন মা

প্রতিবেদক: ব্রিকলেন নিউজ , রাজশাহী:

বয়সের বাধা পেরিয়ে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত

শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে সংসারের শত ব্যস্ততাও যে কোনো বাধা হতে পারে না—তা আবারও প্রমাণ করেছেন রাজশাহীর রাজপাড়া থানার বসিলা এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া বেগম। ছেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন, সংসারের দায়িত্ব সামলে রাত জেগেছেন এবং চূড়ান্ত ফলাফলে অর্জন করেছেন কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫। একই বছর এসএসসি পরীক্ষায় বসে তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদও অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে ফল প্রকাশের পর মা ও ছেলের এই যুগল সাফল্য স্থানীয় পর্যায়ে এক অনন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

১৯ বছরের বিরতি এবং পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প:

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। আজ থেকে প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ের পর সংসার আর সন্তান লালন-পালনের দায়িত্বে সাদিয়া বেগমের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থমকে গিয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর বই-খাতার সঙ্গে দূরত্ব থাকলেও শিক্ষার প্রতি তাঁর তীব্র অনুরাগ কখনো মুছে যায়নি।

দীর্ঘ বিরতির পর সংসারের সব দায়িত্ব সামলে দুই বছর আগে তিনি নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরুর সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার এই সিদ্ধান্তে পরিবারও তাঁকে পূর্ণ সমর্থন জানায়।

যুগল প্রস্তুতি ও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল:

সাদিয়া বেগম চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ থেকে অংশ নেন। অন্যদিকে, তাঁর ছেলে তানভীর আহমেদ রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষায় বসে।

ছেলে যখন পড়ার টেবিলে বসেছে, মা-ও তখন নিজের বই খুলেছেন। সন্তানের পড়াশোনা তদারকির পাশাপাশি নিজের জন্যও নিয়ম করে সময় বের করেছেন তিনি। দিন শেষে তাদের এই যুগল প্রস্তুতির ফলও এসেছে হাত ধরাধরি করে।

অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া: “হাল ছাড়িনি”:

নিজের এই অভাবনীয় সাফল্য এবং দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাদিয়া বেগম বলেন, “পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনি। তবে আমি হাল ছাড়িনি।”

ছেলের ফলাফলের আনন্দ ভাগ করে তিনি আরও জানান, “সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো সংসার সামলিয়ে ও দুই ছেলের পড়ালেখার খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি নিজে পড়ালেখা করে জিপিএ-৫ পেয়েছি। সঙ্গে ছেলের গোল্ডেন জিপিএ-৫। মা-ছেলের এমন সাফল্যে আমার পুরো পরিবার আনন্দিত।”

মায়ের এই লড়াই খুব কাছ থেকে দেখেছে ছেলে তানভীর। উচ্ছ্বসিত তানভীর বলে, “মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কজনের হয়! আমি সেই সৌভাগ্যবান। মা সার্বক্ষণিক আমার পড়ালেখার খোঁজখবর রাখতেন, সঙ্গে নিজেও পড়তেন। রাত জেগে আমার পাশে বসে থাকতেন।” এই সাফল্য সে তার বাবা-মাকে উৎসর্গ করে ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) হওয়ার স্বপ্নের কথা জানায় এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া চায়।

দীর্ঘদিন ধরে তাদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলামও এই অর্জনে অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি বলেন, “আমি চার বছর ধরে তানভীরকে ইংরেজি পড়াই, পাশাপাশি তার মাকেও সহযোগিতা করেছি। দুজনের এমন সাফল্যে আমি অনেক খুশি। এমন একটি বিরল ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।”

অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের বার্তা:

সাদিয়া বেগম ও তানভীর আহমেদের এই সাফল্য নিছক কোনো বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি একটি অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের বাস্তব চিত্র। এটি জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, জীবনের ব্যস্ততা বা দীর্ঘ বিরতি মানুষকে তার লক্ষ্য থেকে চিরতরে সরিয়ে নিতে পারে না, যদি তার ভেতরে ইচ্ছা ও অধ্যবসায় থাকে। একজন মায়ের নতুন করে শুরু করার এই গল্প নিঃসন্দেহে আগামী দিনে আরও অনেককে তাদের থেমে যাওয়া স্বপ্ন পূরণে সাহস জোগাবে।