ব্রিটেনে অভিবাসনসংক্রান্ত আপিল ব্যবস্থায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি সম্ভাব্য আইনি ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক সিনিয়র বিচারক সতর্ক করেছেন, ২০১৪ সাল থেকে ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া বিপুলসংখ্যক মামলার ক্ষেত্রে আইনগত এখতিয়ার ছিল না বলে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১২ বছর আগে পার্লামেন্ট নির্দিষ্ট ধরনের প্রবেশ-সংক্রান্ত আপিল শুনানির ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা সীমিত করেছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পরও ট্রাইব্যুনালগুলো একই ধরনের বহু মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে শত শত, এমনকি হাজারো ব্যক্তি এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্রিটেনে থাকার অনুমতি পেয়ে থাকতে পারেন।
‘ডেইলি মেইল’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু আপার ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালেই এ ধরনের অন্তত ৩ হাজার ৫০০টি আপিল হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৭টি মামলায় এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স অফিসারদের সংশ্লিষ্ট পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিম্ন পর্যায়ের ইমিগ্রেশন ট্রাইব্যুনালগুলোতেও আরও বহু মামলা হয়ে থাকতে পারে। এসব মামলার সব রায় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
বিষয়টি সামনে আসে সোমালি নাগরিক হিন্দা হাসান ওয়াসুগের একটি মামলার শুনানিতে। তিনি তার ব্রিটিশ স্বামীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যে থাকার জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স অফিসার তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তিনি ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন।
মামলাটি শুনতে গিয়ে ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ড্যানিয়েল রাইট ২০১৪ সালের ইমিগ্রেশন আইনের বিধান পর্যালোচনা করেন। ওই আইনের অধীনে আপিলের অধিকার নির্দিষ্ট করা হয়েছিল এমন ক্ষেত্রে, যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কোনো ব্যক্তির বিষয়ে ইমিগ্রেশন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিচারক রাইটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স অফিসারের নেওয়া সিদ্ধান্তকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা যায় না। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনতে ট্রাইব্যুনালের আইনগত এখতিয়ার ছিল না।
বিচারক রাইট বলেন, একজন এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স অফিসার আইনগতভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সমতুল্য নন। তাই সংশ্লিষ্ট আপিলটি শুনানির এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের ছিল না এবং কেবল এখতিয়ার না থাকার কারণেই মামলাটি খারিজ করা যেত।
ওয়াসুগের আইনজীবীরা এর আগে একই ধরনের বহু মামলা ট্রাইব্যুনাল শুনেছে বলে উল্লেখ করেন। তবে বিচারক জানান, এসব মামলায় ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল—এমন কোনো নজির তিনি খুঁজে পাননি।
এই সিদ্ধান্তের পর গত ১২ বছরে একই ধরনের মামলায় দেওয়া ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব মামলার সবগুলোই যে অবৈধ ছিল বা সব মামলায় সংশ্লিষ্ট অভিবাসীরা ব্রিটেনে থাকার অনুমতি পেয়েছেন—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া হয়নি। একইভাবে, এই আইনি ত্রুটির কারণে ঠিক কতজন অভিবাসী উপকৃত হয়ে থাকতে পারেন, তারও নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি।
ব্রিটেনের হোম অফিস অবশ্য বলেছে, এটি ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালের একটি সিদ্ধান্ত। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কোনো আইনি নজির তৈরি করে না এবং এতে বিদ্যমান আইনও পরিবর্তিত হচ্ছে না। হোম অফিস আরও জানিয়েছে, এর কারণে ব্রিটেনের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা পরিচালনার ওপর কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়বে না।
এদিকে, অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিটেন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যেই এই আইনি ত্রুটির বিষয়টি সামনে এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্রিটেন ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ৪০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার একটি পাইলট কর্মসূচি চালু করেছেন।
প্রস্তাবটি এক সপ্তাহের জন্য কার্যকর থাকবে। যারা এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন, তাদের দেশে ফেরার জন্য বিমান ভ্রমণের ব্যবস্থাও করা হবে। ব্রিটেন ছাড়ার পর প্রিপেইড ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে।
হোম অফিসের সূত্রের দাবি, সহায়তাপ্রাপ্ত স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনের খরচ একজন অভিবাসীকে জোরপূর্বক ব্রিটেন থেকে অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৪৮ হাজার পাউন্ডের তুলনায় কম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আশ্রয় আবাসনে অভিবাসীদের রাখার খরচও উল্লেখযোগ্য। তিন সদস্যের একটি অভিবাসী পরিবারকে আশ্রয় আবাসনে রাখার জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার পাউন্ড ব্যয় হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ২০১৪ সালের আইন পরিবর্তনের পর এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স অফিসারের সিদ্ধান্ত নিয়ে হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার কতটা কার্যকর ছিল এবং সংশ্লিষ্ট রায়গুলো অভিবাসীদের অবস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে আইনি বিষয়টি আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে।