Skip to main content

Brick Lane News

বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হল ” মারেফতি মজমা “

বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হল ” মারেফতি মজমা “

যেন এক অখন্ড অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

ইফতেখারুল হক পপলু:

সমৃদ্ধ সিলেটি ঐতিহ্য,সূফি সাধকী সংগীত, ঐতিহ্যের ঔরুস,খাবার ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে প্রবাসের বুকে বহু ভাষাভাষী মানুষের মাঝে তুলে ধরার লক্ষ্যে ,বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘মারেফতি মজমা’। গত রবিবার দুপুরে বার্মিংহামের স্মল হিথ এলাকায় পূর্বনাট স্টুডিও সংলগ্ন হলরুমে এ মারেফতি মজমা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সার্বিক সঞ্চালনায় যৌথভাবে ছিলেন পূর্বনাটের পরিচালক মুরাদ খান ও সিলেট টাউন ক্লাবের সংগঠক শাকিল আহমেদ। বিলেতের সৃজনশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন পূর্বনাট ও সিলেট টাউন ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বার্মিংহাম ও আশপাশের শহর থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেন।
কালচারাল অ্যাকশন এরিয়া অফ স্মলহীথ (CAASH ) এর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সিলেট টাউন ক্লাব ও পুর্বনাট-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বাংলাদেশের সূফী ও মরমী ভাবধারার শিকড়ের সঙ্গে এক গভীর আবেগময় সংযোগ তৈরি করে।
অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল সিলেটি ঐতিহ্যের নানা পরিচিত অনুষঙ্গ। বড় ডেকচিতে রান্না করা শিন্নি, ঐতিহ্যবাহী তুষা শিন্নি, বাতাসা, আখনির জন্য অপেক্ষার সেই চেনা অনুভূতি, ফকিরি ও মুর্শিদি গানের সুর এবং সুফি সংগীত সব মিলিয়ে বার্মিংহামে যেন তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের এক পরিচিত সাংস্কৃতিক আবহ।
বিশেষ করে প্রাণ ছোঁয়া ফকিরি, মুর্শিদি ও সুফি সংগীত পুরো আয়োজনকে করে তোলে আরও আবেগঘন ও স্মৃতিময়। প্রবাসে বসবাসরত মানুষের কাছে এসব গান ও সাংস্কৃতিক উপাদান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এগুলো শিকড়, পরিচয় ও পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন পূর্বনাটের পরিচালক মুরাদ খান।
অনুষ্ঠানে খাবার, সংগীত ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে বিলেতে বাংলাদেশি প্রজন্ম ও বহু ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সুফি ভাবধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনিময়ের একটি পরিবেশ তৈরি করাই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে সবাই মিলে শিন্নি ভাগ করে খাওয়ার মুহূর্তটি আয়োজনের অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আপনত্বের অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে। তাইতো ‘মারেফতি মজমা’ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ছিল পরিচয়, স্মৃতি, সংস্কৃতি, সংগীত এবং আপনজনদের সঙ্গে আন্ত-সংযোগের এক সম্মিলিত উদযাপন। বিশেষ করে মাতৃভূমি থেকে দূরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নিজেদের ঐতিহ্যকে নতুনভাবে অনুভব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন সিলেট টাউন ক্লাবের অন্যতম উদ্যোক্তা জেবতিক রাজীব হক।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে সিলেট টাউন ক্লাবের আরেক সংগঠক শাকিল আহমেদ জানান, সিলেটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বিলেতের ব্রিটিশ বাংলাদেশি প্রজন্মের সংযোগ আরও শক্তিশালী করা এবং প্রবাসে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ ও উদযাপন করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে। ‘মারেফতি মজমা’ সফল ও স্মরণীয় করে তুলতে যাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের সবাইকে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহজালালের দরগার গিলাফ টানানোর আদলে লাল সামিয়ানা টানিয়ে তুষা শিন্নি নিয়ে শাহজালালের গান গেয়ে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করা হয়। এরপর সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ পর্বে বেশ কজন বিদগ্ধজন সিলেটের শাহজালালের দরগার ঔরুষের স্মৃতিচারণ ও মরমী সুফি ভাবধারার ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও স্মৃতিচারণে অংশ নেন গোলাম মোস্তফা চৌধুরী যুবরাজ, মুরাদ খান, শাকিল আহমদ, স্যানডওয়েল কাউন্সিলের কাউন্সিলর জালাল উদ্দিন, নোমান আল মনসুর, নাসির উদ্দিন হেলাল, ওবায়দুল হাসান লোদী, আফসানা সালাম, তানজিনা হোসাইন প্রমূখ। বক্তারা সিলেটি ঐতিহ্যকে উদযাপন, সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই সাংস্কৃতিক যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য পূর্বনাট ও সিলেট টাউন ক্লাবের প্রতি আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানের খাবার পর্বশেষে সূফী সাধকী গানের সাথে সবাই একাত্ব হয়ে উঠেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা গানের অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় মরমী সাধকীসহ হাসন লালন কিংবা কীতনীয়া গান। বাউল ইকরাম উদ্দিনের কন্ঠে “বাবা শাহজালালের দেশ” কিংবা রোজী সরকারের কন্ঠে লালন সাঁইজির সাধু গান এক অখন্ড অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হয়ে ফুটে উঠে। আর অনুষ্ঠানে উপস্থিত সূধীজনরা সকল অশুভের বিরুদ্ধে দেশ মাতৃকার সকল মানুষের শান্তি ও সম্প্রীতি কামনার মধ্য দিয়ে ফিরে যান নিজ নিজ যাপিত জীবনে।