Skip to main content

Brick Lane News

বাংলাদেশ বন্দর ব্যবস্থাপনায় কমছে চীনা আধিপত্য

বাংলাদেশ বন্দর ব্যবস্থাপনায় কমছে চীনা আধিপত্য

বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো

বাংলাদেশের বিএনপি সরকার দেশের বন্দর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে বঙ্গোপসাগর ও এর বাইরেও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ অর্জনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারে চীনের পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়েছে।

গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় চীনকে মোংলা বন্দর উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চীনের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় মোংলা বন্দরে আধুনিক যন্ত্রপাতিসজ্জিত দুটি অত্যাধুনিক কনটেইনার জেটি নির্মাণ করা হবে। এর উদ্দেশ্য বন্দরের পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বাড়ানো। প্রকল্পের আওতায় দুটি কনটেইনার ইয়ার্ডও নির্মাণের কথা রয়েছে। এর একটি হবে বোঝাই কনটেইনারের জন্য, অন্যটি খালি কনটেইনার রাখার জন্য। পাশাপাশি বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ইয়ার্ডও নির্মাণ করা হবে।

তবে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে জাপানের বিনিয়োগে। অন্যদিকে, সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ডেনমার্কের মায়ের্স্ক গ্রুপের সঙ্গে ৩০ বছরের একটি চুক্তি করেছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ টার্মিনাল পরিচালনাকারী এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করা হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার ধারাবাহিক সরকারগুলো বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভরশীল না থেকে অন্যান্য বিদেশি পক্ষকেও যুক্ত করার চেষ্টা করছে। মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়নে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহজ শর্তের ঋণসংক্রান্ত চুক্তি এবং চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়নে ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, দুটিই ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মাতারবাড়ী প্রকল্পের চুক্তি হয় এপ্রিলে এবং লালদিয়া প্রকল্পের চুক্তি ডিসেম্বরে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ ও স্থাপনাগুলোর আশপাশে চীনের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত উপস্থিতি বাড়লে কৌশলগত কারণে ভারত উদ্বিগ্ন হতে পারে। এ কারণে তিনি চীনের সহায়তায় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

চট্টগ্রামে লালদিয়া গ্রিনফিল্ড কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়নে মায়ের্স্ক গ্রুপকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশের নৌপরিবহনমন্ত্রী রাবিউল ইসলাম বলেছেন, দেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে আর অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, চট্টগ্রাম বন্দর বর্তমানে একধরনের ‘স্থবিরতার’ মধ্যে রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ, কনটেইনার ও পণ্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োজনীয় মানে পৌঁছাতে পারেনি। বন্দর ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় দক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এই স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারে।

লালদিয়া টার্মিনালে মায়ের্স্ক গ্রুপের প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বা ৫৫ কোটি ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি হবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউরোপের কোনো প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় একক ইকুইটি বিনিয়োগ। এপি মোলার-মায়ের্স্কের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বিভির বাংলাদেশের বন্দর খাতে প্রবেশ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আস্থা তৈরি করবে এবং দেশে অতিরিক্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকৃষ্ট করতে পারে।

নতুন এই গ্রিন পোর্ট টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ভিড়তে সক্ষম জাহাজের তুলনায় দ্বিগুণ আকারের কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানো যাবে। এর ফলে প্রতি একক পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি জাহাজ চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। বন্দরে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং রাতেও জাহাজ চলাচলের সুবিধা থাকবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় আসা প্রথম টার্মিনাল হলো পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল এই টার্মিনাল পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালের জুনে টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে।

গত ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের মালিকানা, জমি, অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির দায়িত্ব নিজেদের কাছে রাখবে। টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বামপন্থী শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তবে সরকারের বক্তব্য, এই চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত পরিচালনব্যবস্থা চালু হবে, ফলে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমে আসবে।

এদিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে, আশপাশে শিল্পপার্ক নির্মাণে যুক্ত রয়েছে এবং ভবিষ্যতের টার্মিনাল আধুনিকায়ন প্রকল্পগুলোতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সরকার-টু-সরকার উদ্যোগের আওতায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৮০০ একর জমিতে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ ২০১০ সাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে আসছে। চীন চট্টগ্রাম শোধনাগারে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি তেল খালাসের জন্য একটি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো একটি তেলবাহী জাহাজ চীনের পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরোর নির্মিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল খালাস করে।

তবে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ব্যবস্থাটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরে বাতিল করা হয়। কারণ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই চুক্তিটি দেওয়া হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বর্তমানে ব্যবস্থাটির নিয়মিত কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া আরও এগিয়েছে। সম্প্রতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কক্সবাজারে অবস্থিত এই স্থাপনার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাঁচ বছরের জন্য ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে টার্মিনাল ইজারা দেওয়া এবং পরিচালনার দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ এখন চীনা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে অন্যান্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

আনোয়ারা প্রকল্পের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে চীনের উপস্থিতি বাড়লে তা বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক স্বার্থ পূরণ করবে। মোংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের সম্পৃক্ততা দেশটির পোশাকশিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থেও সহায়ক হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের কেন্দ্র ঢাকা। চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় মোংলা বন্দর ঢাকার কাছাকাছি অবস্থিত।

তবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তার, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কিংবা ভারতকে ঘিরে ফেলার জন্য চীনের কথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু মোংলা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট হবে না।

মোংলা একটি নদীবন্দর, যা সমুদ্র থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এ কারণে এটি নৌবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে বৈশ্বিক বন্দর ও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি থাকায় সেখানে চীনের কোনো নৌ-উপস্থিতি তৈরি হলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম।

ফলে ঢাকার সরকারের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চীনা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হলেও দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ব্যবহার করে চীনের কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত রাখার চেষ্টা চলছে।