সুশান্ত দাস গুপ্ত, ব্রিকলেন, লন্ডন:
এবারে সাহিত্যে যিনি নোবেল পেলেন উনাকে কেন নোবেল দেওয়া হলো? এক প্যারাগ্রাফে লিখতে পারবেন উদাহরণসহ যেন সাধারণ মানুষ তার অবদানটুকু সহজেই বুঝতে পারে?” আমাকে জিগাইলো এক ছোট ভাই।
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন কানাডার কবি ও লেখক অ্যান কারসন। এক লাইনে বললে, প্রাচীন সাহিত্যকে নতুনভাবে ব্যবহার করে এবং কবিতা, গদ্য ও অনুবাদকে মিলিয়ে আধুনিক সাহিত্যে নতুন রূপ সৃষ্টি করার জন্য তাকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
তার অবদান বোঝার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। অটোবায়োগ্রাফি অব রেড বইয়ে গ্রিক পুরাণের লাল রঙের ডানাওয়ালা দানব গেরিয়নকে তিনি আধুনিক সময়ের এক সংবেদনশীল তরুণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যে পরিবারের নির্যাতন সহ্য করে, ভালোবাসে, প্রত্যাখ্যাত হয় এবং ছবি তোলার মধ্যে আশ্রয় খোঁজে। উপন্যাসের এই জীবনকাহিনি বলেছেন কবিতার ভাষায়। সহজভাবে পড়লে গল্পটি আমাদের ভাবায়, বাইরে থেকে অদ্ভুত মনে হওয়া মানুষের ভেতরেও আমাদের মতো ভালোবাসা ও কষ্ট আছে।
নক্স বইয়ে ভাইয়ের মৃত্যুর শোক প্রকাশ করেছেন পুরোনো চিঠি, পারিবারিক ছবি, স্মৃতির টুকরো ও কবিতা একসঙ্গে সাজিয়ে। বইটি ভাঁজ খুলে পড়তে হয়। অনেকটা প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া জিনিসপত্র ছুঁয়ে তাকে খোঁজার মতো; এখানে বইয়ের গঠনও শোক প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে।
দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড বইয়ে একটি দাম্পত্য ভেঙে যাওয়ার কাহিনি সাজিয়েছেন ২৯টি কবিতার অংশে, যেগুলোর নাম দিয়েছেন ট্যাঙ্গো। ট্যাঙ্গো একধরনের নাচ। দুজনের নাচে যেমন কখনো ছন্দ মেলে, কখনো তাল কাটে, তেমনি সম্পর্কের আকর্ষণ ও যন্ত্রণাকেও এই গঠনের মাধ্যমে অনুভব করা যায়।
নর্মা জিন বেকার অব ট্রয় বইয়ে প্রাচীন পুরাণের হেলেন ও হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর কাহিনি মিলিয়ে তাদের নিজেদের দৃষ্টিকোণ সামনে এনেছেন। বইটি আমাদের ভাবায়, সমাজ কোনো নারীকে সৌন্দর্যের প্রতীক বানিয়ে ফেললে তার নিজের অনুভূতি ও কষ্ট কতটা আড়ালে পড়ে যায়। হাজার বছরের ব্যবধানের দুই নারীকে পাশাপাশি এনে তিনি এই অভিজ্ঞতা দেখতে সাহায্য করেছেন।
আর ইফ নট, উইন্টার বইয়ে প্রাচীন গ্রিক কবি সাফোর খণ্ডিত কবিতা অনুবাদ করার সময় হারিয়ে যাওয়া অংশের জায়গায় ফাঁকা স্থান ও বন্ধনী রেখেছেন। পুরোনো ছেঁড়া চিঠি পড়ার মতোই পাঠক সেখানে পাওয়া কথাগুলোর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া কথাগুলোর অভাবও অনুভব করেন। কারসন এভাবে অনুবাদের মধ্যেও সময়, স্মৃতি ও হারানোর অনুভূতি প্রকাশের জায়গা তৈরি করেছেন।
অ্যান কারসনের বিশেষ অবদান হলো, মানুষের চিরচেনা ভালোবাসা, শোক ও সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশের নতুন পথ তৈরি করা। তার লেখায় প্রাচীন পুরাণের চরিত্র আজকের মানুষের অনুভূতি বহন করে, পুরোনো ছবি ও চিঠি কবিতার অংশ হয়ে ওঠে, এমনকি হারিয়ে যাওয়া কথার ফাঁকও পাঠককে ভাবায়। কবিতা, গদ্য, অনুবাদ ও স্মৃতিকে মিলিয়ে তিনি সাহিত্য পড়ার অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে সাজিয়েছেন। তার নোবেল পুরস্কার এই সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি, যেখানে হাজার বছরের পুরোনো গল্পও আমাদের বর্তমান জীবনের ভালোবাসা, বেদনা ও নিজের পরিচয় খোঁজার কথা বলে।