Skip to main content

Brick Lane News

দুই হাতের মিল, থ্যালিডোমাইড ট্র্যাজেডি এবং রসায়নে নোবেল জয়ের পেছনের গল্প

দুই হাতের মিল, থ্যালিডোমাইড ট্র্যাজেডি এবং রসায়নে নোবেল জয়ের পেছনের গল্প

ডান হাত আর বাম হাত দেখতে এক হলেও তারা কখনো পুরোপুরি মিলে যায় না—অণুর জগতেও ঠিক তাই। একটি রূপ যখন জীবন বাঁচায়, অন্য রূপটি হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। রসায়নের এই রহস্য ভেদ করে কীভাবে মানবজাতিকে নিরাপদ ওষুধের নিশ্চয়তা দিলেন হেনরি কাগন ও কেনসো সোয়াই? বিস্তারিত পড়ুন সুশান্ত দাস গুপ্তের কলমে।
রসায়নে এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হেনরি কাগন ( ফরাসি) এবং কেনসো সোয়াই (জাপানি)। কিন্তু বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের খটমটে নাম দেখেই সাধারণ মানুষের মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়! কী যেন সেই নাম? “জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং অসমমিত সংশ্লেষণে স্বয়ংক্রিয় অনুঘটন প্রক্রিয়া।”
বাপরে বাপ! সাধারণ মানুষ তো দূর, বিজ্ঞানের ছাত্ররাও এই নাম শুনে খানিকটা থমকে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে— ল্যাবরেটরির এই জটিল ভাঙা-গড়ার খেলায় আমার বা আপনার মতো সাধারণ পাবলিকের লাভটা কী? কেনই বা এই খটমটে তত্ত্বের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেওয়া হলো? চলুন, কোনো জটিল সমীকরণ ছাড়া, একদম গল্পের মতো করে সহজ ভাষায় বোঝা যাক বিষয়টির আসল রহস্য।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের নিজেদের দুই হাতের দিকে তাকাতে হবে। আমাদের ডান হাত আর বাম হাত দেখতে হুবহু এক, তাই না? কিন্তু আপনি যদি ডান হাতের ওপর বাম হাতটা পাতেন, দেখবেন দুটো কিন্তু মিলবে না, বুড়ো আঙুল দুটো দুই দিকে চলে যাবে। আয়নায় যদি ডান হাত দেখেন, সেটাকে বাম হাতের মতো দেখাবে।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কাইরালিটি’ বা সহজ কথায় প্রতিসাম্য। আমাদের শরীরের ভেতরে যে ডিএনএ, প্রোটিন বা কোশ আছে, তাদেরও এমন ‘ডানহাতি’ আর ‘বামহাতি’ রূপ আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের শরীর কেবল একদিকের রূপটাকেই গ্রহণ করে। ওষুধের জগতেও এই ডানহাতি আর বামহাতি অণুর খেলা চলে। যখন ল্যাবরেটরিতে কোনো ওষুধ তৈরি করা হয়, তখন সাধারণত এই দুই রূপ সমান ৫০-৫০ অনুপাতে তৈরি হয়।
১৯৬০-এর দশকে ইউরোপে গর্ভবতী মায়েদের সকালের ক্লান্তি বা বমিভাব দূর করার জন্য ‘থ্যালিডোমাইড’ নামের একটি ওষুধ দেওয়া হতো। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন ওষুধটি চমৎকার কাজ করছে, কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, হাজার হাজার শিশু মারাত্মক শারীরিক বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে।
পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল, থ্যালিডোমাইড ওষুধের যে ‘ডানহাতি’ অণু ছিল, তা রোগ সারাত, কিন্তু তার সাথে মিশে থাকা ‘বামহাতি’ অণুটা ছিল চরম বিষাক্ত, যা গর্ভের শিশুর ক্ষতি করছিল। দুটো দেখতে এক হলেও, শরীরের ভেতর তাদের কাজ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বিজ্ঞানীদের সামনে তখন মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ— কীভাবে ওষুধের ক্ষতিকর রূপটাকে বাদ দিয়ে কেবল উপকারী ‘একমুখী’ অণু তৈরি করা যায়? একেই বলে অসমমিত সংশ্লেষণ।
এই ক্ষতিকর অংশ বাদ দেওয়ার কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। এখানেই জাদুর কাঠি নিয়ে হাজির হলেন হেনরি কাগন এবং কেনসো সোয়াই। কেনসো সোয়াই দেখালেন যে, বিক্রিয়া শুরু করার জন্য বাইরে থেকে দামি রাসায়নিক দেওয়ার দরকার নেই। বিক্রিয়ায় যে কাঙ্ক্ষিত অণুটা তৈরি হচ্ছে, সে নিজেই নিজের ‘অনুলিপি’ বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, একটা ভালো অণু তৈরি হলে, সে নিজেই তার মতো আরও হাজারটা ভালো অণু তৈরি করে ফেলে, যাকে বলে স্বয়ংক্রিয় অনুঘটন। অন্যদিকে হেনরি কাগন দেখালেন, শুরুতে যদি আমাদের কাছে থাকা কাঁচামাল খুব বেশি খাঁটি নাও হয় (ধরা যাক, সামান্য একটু ভালো অণু আর অনেকখানি ভেজাল অণু আছে), তবুও বিক্রিয়ার বিশেষ নিয়মে শেষ পর্যন্ত শতভাগ খাঁটি ও নিরাপদ অণুই পাওয়া সম্ভব। রসায়নের পরিভাষায় এটাই হলো অরৈখিক প্রভাব।
তাহলে সাধারণ মানুষের লাভ কী হলো? আজ আপনি বাজার থেকে যে ক্যানসারের ওষুধ, হার্টের ওষুধ কিংবা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কিনছেন, তা শতভাগ নিরাপদ। কাগন ও সোয়াই-এর পদ্ধতির কারণে ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন ক্ষতিকর প্রতিসম রূপটিকে পুরোপুরি ছেঁকে বাদ দিয়ে কেবল খাঁটি ওষুধটি আপনার হাতে তুলে দিতে পারছে।
আগে এই ধরণের নিখুঁত ওষুধ তৈরি করতে ল্যাবে কোটি কোটি টাকার খরচ হতো। এই দুই বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের ফলে ওষুধ তৈরির খরচ এবং অপচয়— দুই-ই কমে গেছে নাটকীয়ভাবে, যার পরোক্ষ সুবিধা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং ওষুধের দাম থাকছে নাগালের মধ্যে। শুধু ওষুধ নয়, আমাদের ফসলে যে কীটনাশক দেওয়া হয় বা খাবারে যে কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করা হয়, সেগুলোতেও এখন ক্ষতিকর উপাদান বাদ দিয়ে কেবল কার্যকর অংশটুকু ব্যবহার করা যাচ্ছে। ফলে পরিবেশ ও মানবদেহের ক্ষতি হচ্ছে অনেক কম।
বিজ্ঞান মানেই কেবল ল্যাবরেটরির টেস্টটিউব আর চার দেয়ালের ভেতরের গবেষণা নয়। কাগন আর সোয়াই-এর এই আবিষ্কারটি তাত্ত্বিকভাবে যতটাই জটিল শোনাক না কেন, এর মূল কাজটা কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচানো। আজ ফার্মেসিতে গিয়ে আপনি যে নিরাপদ ওষুধটি কিনতে পারছেন, তার পেছনে নীরবে কাজ করে গেছে এই দুই বিজ্ঞানীর বছরের পর বছর ধরে করা এই “খটমটে” গবেষণাটিই। আর ঠিক এই কারণেই, মানবজাতিকে আরও সুরক্ষিত করার পুরস্কার হিসেবে তেনাদের ঝুলিতে উঠেছে চলতি বছরের নোবেল প্রাইজ!