Skip to main content

Brick Lane News

হ্যালোইন থেকে ভূত পোড়ানো: হাজার মাইল দূরে থেকেও মানুষের সংস্কৃতিতে এত মিল কেন?

হ্যালোইন থেকে ভূত পোড়ানো: হাজার মাইল দূরে থেকেও মানুষের সংস্কৃতিতে এত মিল কেন?

জুয়েল রাজ-

পৃথিবীর এক প্রান্তে হ্যালোইন, অন্য প্রান্তে  গ্রামীণ জনপদে ‘ভোলা ছাড়ানো’ কিংবা ‘ভূত পোড়ানো’। মাঝখানে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব, ভাষা আলাদা, ধর্ম আলাদা, জীবনযাপনের ধরনও ভিন্ন। অথচ উৎসবগুলোর অন্তর্নিহিত ভাবনা, আচার-অনুষ্ঠান ও প্রতীকী প্রকাশের মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর কিছু মিল।

এই মিল কি নিছক কাকতালীয়? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের আদিম সাংস্কৃতিক সংযোগের কোনো চিহ্ন?

মানবসভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ প্রকৃতি, ঋতু পরিবর্তন, ফসল, মৃত্যু এবং অজানা শক্তিকে ঘিরে নানা ধরনের বিশ্বাস ও উৎসব গড়ে তুলেছে। ভৌগোলিক দূরত্ব ও ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও এসব উৎসবের মধ্যে অনেক সময় এমন কিছু সাদৃশ্য দেখা যায়, যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কি সত্যিই এতটা বিচ্ছিন্ন?

বাংলাদেশের বিভিন্ন  গ্রামীণ জনপদে একসময় কার্তিক সংক্রান্তি কিংবা অগ্রহায়ণের প্রথম দিনকে ঘিরে পালিত হতো এক বিশেষ লোকাচার, যার নাম ‘ভোলা ছাড়ানো’। হিন্দু মুসলিম সব ধর্মের মাঝেই এই  লোকাচার আমি দেখেছি।

সকালে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেত। তাদের হাতে থাকত কলাগাছের পাতা ছাড়ানো নরম ডাল, যাকে সিলেটি ভাষায় বলা হয় ‘পাছল’, কিংবা কচুর ডগা।

বাড়ির গুরুজন কিংবা ঠাট্টা-সম্পর্কের আত্মীয়, যেমন ভাবি, দুলাভাই, দাদা-দাদির শরীরে সেই নরম ডাল দিয়ে আলতো করে ছোঁয়া দেওয়া হতো। এর মধ্য দিয়ে উচ্চারণ করা হতো একটি লোকছড়া।

“ভোলা ছাড় ভুলি ছাড়,

বারো  মাইয়া পিছা ছাড়,

ভাত খাইয়া লড়চড়

পানি খাইয়া পেট ভর।”

এই ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে ছিল সুস্থতা, সমৃদ্ধি ও অশুভ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বছরের বারো মাসের রোগব্যাধি, আলস্য, জরাজীর্ণতা ও অলক্ষ্মী যেন মানুষের শরীর ও সংসার ছেড়ে চলে যায়। মানুষ যেন পেট ভরে ভাত খেয়ে সুস্থ শরীরে কাজ করতে পারে, এটাই ছিল প্রার্থনা।

সন্ধ্যার দিকে বাঁশ, খড় ও শুকনো পাতা দিয়ে মানুষের মতো অবয়বের একটি প্রতীকী মূর্তি তৈরি করা হতো। সেটির নাম ‘ভোলা’।

এরপর সবাই মিলে সেই ভোলায় আগুন ধরিয়ে দিত। আগুন দেওয়ার সময় উচ্চারিত হতো আরেকটি ছড়া:

“ভোলা পুড়, ভুলি পুড়,
মশা মাছি বাইর-হ।
টাকা পয়সা ঘর-ল,
সংসারের জঞ্জাল দূর-হ!”

আগুনের শিখায় পুড়ে যেত প্রতীকী ভোলা। আর সেই আগুনের সঙ্গে যেন পুড়ে ছাই হয়ে যেত পুরোনো বছরের রোগব্যাধি, দুঃখ, দুর্দশা ও সংসারের অমঙ্গল।

 

বাঙালি  সনাতনী সংস্কৃতিতে কালীপূজার আগের রাতে ভূত চতুর্দশী পালন করা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে পরলোক এবং ইহলোকের মাঝখানের পর্দাটি খুব পাতলা হয়ে যায়, যার ফলে মৃত চৌদ্দ পুরুষের আত্মা এবং অন্যান্য ভূত-প্রেত মর্ত্যে নেমে আসে।ঘর থেকে অন্ধকার ও ক্ষতিকারক ভূত-প্রেত বা অশুভ আত্মাদের দূরে রাখতে বাড়ির প্রতিটি অন্ধকার কোণ, প্রবেশদ্বার ও জানালায় ১৪টি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। আগুনের এই আলো একদিকে যেমন পূর্বপুরুষদের পথ দেখায়, অন্যদিকে তেমনি অশুভ শক্তিকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। এমনটি বিশ্বাস করেন তারা।

ঠিক একই ধরণের ভারতের উত্তর ও পশ্চিম ভারতে দোল বা হোলি খেলার আগের রাতে ‘হোলিকা দহন’ বা ‘ন্যাড়াপোড়া’ উৎসব পালন করা হয়।
মধ্যপ্রদেশের মালাজপুর এবং বিহারের কিছু অঞ্চলে প্রতি বছর ঐতিহ্যবাহী ‘ভূতের মেলা’ (Bhooton Ka Mela) বসে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, যাদের ওপর ভূত বা দুষ্ট আত্মা ভর করে, তান্ত্রিক ও ওঝারা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা দূর করেন। এই ধরণের ঝাড়ফুঁকে তান্ত্রিকরা কর্পূর পোড়ানো, মশাল জ্বালানো বা আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো “অগ্নি পরীক্ষা” ব্যবহার করেন, কারণ মনে করা হয় ভূত বা জিন আগুনের তাপ সহ্য করতে পারে না।
ইসলামের আবির্ভাবের আগে, প্রাচীন আরব বেদুইনদের বিশ্বাস ছিল যে মরুভূমি, জঙ্গল এবং পরিত্যক্ত স্থানে ক্ষতিকারক জিন ও শয়তান বাস করে। তারা বিশ্বাস করত তীব্র গন্ধযুক্ত ধোঁয়া অপশক্তি সহ্য করতে পারে না। তাই তারা বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক আঠা বা কাঠের টুকরো (যেমন ওদ, লোবান বা বিশেষ লতাগুল্ম) আগুনে পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া দিয়ে ঘরবাড়ি এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবগাহন করাত। আরব সংস্কৃতিতে ‘বখুর’ (Bakhoor) পোড়ানোর যে ব্যাপক ঐতিহ্য রয়েছে, তার নান্দনিক ও সুগন্ধি ব্যবহারের পাশাপাশি একটি প্রাচীন আধ্যাত্মিক শিকড় রয়েছে—যা ঘরকে নেতিবাচক শক্তি বা দুষ্ট জিনের নজর থেকে মুক্ত রাখে।
আরব সংস্কৃতিতে সরাসরি “ভূত পোড়ানো”র উৎসব না থাকলেও, তীব্র সুগন্ধি ধূপ (বখুর) পোড়ানো, লবণ দহন এবং বিশেষ জাদুকরী আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাচীনকাল থেকেই অপশক্তি তাড়ানোর একটি সমান্তরাল ইতিহাস বজায় রয়েছে।
ছেলেবেলায় দেখেছি,সিলেটের কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে কার্তিক সংক্রান্তিকে ঘিরে ‘ভূত পোড়ানো’ নামেও একটি লোকাচারের প্রচলন ছিল।সংক্রান্তির আগের দিন গ্রামের তরুণ ও যুবকেরা মাঠের মাঝে কিংবা রাস্তার ধারে খড়, বাঁশ ও শুকনো পাতা দিয়ে একটি প্রতীকী ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করত। কোথাও একে ‘বুড়ো বাড়ি’ বলা হতো।

সংক্রান্তির দিন ভোরে কিংবা সন্ধ্যায় সেই খড়ের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো। আগুন জ্বলে উঠলে সবাই মিলে আনন্দে চিৎকার করত। লোকবিশ্বাস ছিল, এর মধ্য দিয়ে সমস্ত অশুভ শক্তি, ভূত-প্রেত ও অলক্ষ্মী পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

এখানে ‘ভূত’ শব্দটিকে শুধু প্রেতাত্মা হিসেবে দেখলে লোকাচারটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি পুরোনো সময়ের দুঃখ-দুর্দশা, জরাজীর্ণতা ও অমঙ্গলকে বিদায় জানানোর একটি প্রতীকী প্রকাশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

কার্তিক মাসে  নানা রকম রোগ ব্যাধি, মহামারী , ডাইরিয়া ইত্যাদি রোগের প্রকোপ দেখা যেত।  এবং এসব অশুভ শক্তি হিসাবেই মানুষ ভাবত। কার্তিক মাসের ম্লান ও অন্ধকার সময়কে বিদায় জানিয়ে নতুন মাসকে স্বাগত জানানো, শীতের আগমনী বার্তা এবং নতুন ফসলের প্রত্যাশা, সবকিছুই যেন এই আগুনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে কার্তিক মাসকে অনেক সময় ‘মরা কার্তিক’ বলা হতো। এ সময় ঘরে ফসল কম থাকত, অভাব-অনটন দেখা দিত। অগ্রহায়ণে নতুন আমন ধান ঘরে তোলার প্রত্যাশায় কৃষকেরা প্রার্থনা করতেন, আগামী দিনগুলো যেন সুদিন নিয়ে আসে।

পৃথিবীর আরেক প্রান্তে, ইউরোপের প্রাচীন কেল্টিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ছিল ‘সামহেইন’ নামের একটি উৎসব।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে কেল্টিক জনগোষ্ঠী এই উৎসব পালন করত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পহেলা নভেম্বর ছিল নতুন বছরের শুরু। তার আগের দিন, অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর, পালিত হতো সামহেইন।

এই সময় গ্রীষ্মের সমাপ্তি ঘটত, শুরু হতো শীতের দীর্ঘ অন্ধকার সময়। মানুষ বিশ্বাস করত, এই রাতে জীবিত ও মৃতের জগতের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে।

পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে সামহেইন উৎসবের নানা রীতি পরিবর্তিত হয়। ‘অল হ্যালোস ইভ’ থেকে এসেছে ‘হ্যালোইন’ নামটি। বর্তমানে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আঙ্গিকে পালিত হয়।

ভুতুড়ে পোশাক পরা, কুমড়ো দিয়ে বাড়ি সাজানো, প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি বা ক্যান্ডি চাওয়া এবং ‘ট্রিক অর ট্রিট’ বলা, এসবই এখন হ্যালোইনের পরিচিত অংশ।

প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব আজ ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী আনন্দ, বিনোদন ও বাণিজ্যের একটি বড় উপলক্ষে পরিণত হয়েছে।

আমাদের  ‘ভোলা ছাড়ানো’ কিংবা ‘ভূত পোড়ানো’র সঙ্গে হ্যালোইনের তুলনা করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।প্রথমত, উভয় ক্ষেত্রেই পুরোনো সময়কে বিদায় জানানো এবং নতুন সময়কে স্বাগত জানানোর প্রবণতা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আগুনের ব্যবহার।  প্রতীকী ভোলা কিংবা খড়ের ঘরে আগুন ধরিয়ে অশুভ দূর করার বিশ্বাস ছিল। প্রাচীন ইউরোপের সামহেইন উৎসবেও আগুন ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতীক।

তৃতীয়ত, অদৃশ্য শক্তি ও মৃতদের জগতকে ঘিরে মানুষের কল্পনা এবং বিশ্বাস। উভয় সংস্কৃতিতেই এসব ধারণা উৎসবের নানা আচার-অনুষ্ঠানে প্রকাশ পেয়েছে।

তবে এই সাদৃশ্যের অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের লোকাচার সরাসরি ইউরোপের সামহেইন বা হ্যালোইন থেকে এসেছে। কিংবা হ্যালোইনের সঙ্গে  আমাদের লোকজ সংস্কৃতির  কোনো প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক সংযোগ ছিল, এমন প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

বরং এই মিল বরং ভীন্ন ভাবনার অবতারণা করে। পৃথিবীর পথে পথে মানব সভ্যতা ছড়িয়ে পড়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। ইতিহাস বলে, একসময় মানুষের পূর্বপুরুষেরা একই ভূখণ্ডে বসবাস করত। পরে খাদ্য, জলবায়ু, জীবিকা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে ভাষা, বিশ্বাস, লোককথা, আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

আবার, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ একই ধরনের প্রাকৃতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। শীতের আগমন, ফসলের অভাব, অন্ধকারের দীর্ঘতা, রোগব্যাধি কিংবা মৃত্যুভয়, এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে একই ধরনের ভাবনা ও আচরণের জন্ম দিতে পারে।

তাই বাংলাদেশের বা এশিয়ার  গ্রামীণ লোকাচার ও ইউরোপের হ্যালোইনের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক কল্পনার মধ্যে গভীর কিছু মিল রয়েছে।এগুলোকে মানুষের প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংযোগের সম্ভাব্য চিহ্ন ।হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও মানুষ কেন একই ধরনের প্রতীক তৈরি করে? কেন আগুনের মাধ্যমে পুরোনোকে বিদায় জানায়? কেন অদৃশ্য শক্তিকে ঘিরে উৎসব গড়ে তোলে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় মানবসভ্যতার সেই সুদূর অতীতে, যখন মানুষ আজকের মতো রাষ্ট্র, জাতি কিংবা ধর্মের পরিচয়ে বিভক্ত ছিল না।তখন মানুষ ছিল প্রকৃতির সন্তান। তাদের আনন্দ, ভয়, আশা ও আকাঙ্ক্ষার ভাষাও ছিল অনেকটা একই রকম।

সিলেটের ‘ভোলা ছাড়ানো’ আর ইউরোপের ‘হ্যালোইন’ তাই শুধু দুটি ভিন্ন অঞ্চলের উৎসব নয়। এগুলো মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এমন কিছু জানালা, যার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই পৃথিবীর পথে পথে ছড়িয়ে পড়া মানুষের অভিন্ন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও কল্পনার এক দীর্ঘ যাত্রা।

হয়তো এই লোকাচারগুলোর মধ্যেই রয়ে গেছে আমাদের সেই আদিম সংযোগের কিছু অস্পষ্ট দাগ, যা মনে করিয়ে দেয়, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই বাড়ুক, মানুষ তার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে একে অপরের কাছাকাছি।