জেনেভা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশ এত দ্রুতগতিতে ঘটছে যে, তা বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তিটি যে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় বা ক্ষতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বুধবার জাতিসংঘের একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
‘ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্টিফিক প্যানেল অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর মতে, বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে একটি বড় সংকটের মুখে পড়েছেন। এআইকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণের প্রয়োজন, কিন্তু প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য দ্রুত বিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে সেই প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দ্রুত বিকশিত ‘এজেন্টিক এআই’ জাতিসংঘের ৪০ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত এই প্যানেলের কো-চেয়ার ইয়োশুয়া বেঙ্গিও বলেন, “এআই-এর সক্ষমতা বিজ্ঞানীদের বোঝাপড়া এবং সরকারের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা—উভয়কেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই-এর কাজের জটিলতা প্রতি চার থেকে সাত মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে ‘এজেন্টিক এআই’ (Agentic AI) সিস্টেমগুলো বাস্তব জীবনের জটিল কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে। বর্তমানে এআই গণিত ও বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের যুক্তি দেখাতে পারছে এবং ওষুধ ও ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গতি ত্বরান্বিত করছে। মানুষের যে কাজ করতে কয়েক দিন বা সপ্তাহ লাগে, এআই তা মুহূর্তের মধ্যেই করে ফেলতে পারে।
সুরক্ষা ঝুঁকি ও প্রতারণামূলক আচরণ অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে এআই-এর বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও এর সুরক্ষা নিয়ে প্যানেলটি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিনিয়ত স্বায়ত্তশাসিত হয়ে ওঠা এআই সিস্টেমগুলোর ওপর থেকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া এআই-এর প্রতারণামূলক আচরণের প্রমাণও ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানো, সাইবার হামলা, জালিয়াতি এমনকি জৈবিক হুমকিও তৈরি করা হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেরই এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তি মূল্যায়ন বা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নেই, যা তাদের আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা সীমিত টেস্টিং ডেটার ওপর নির্ভর করেই বর্তমানে নিরাপত্তা সরঞ্জামগুলো কাজ করছে, যা যথেষ্ট নয়।
জাতিসংঘের আহ্বান ও নতুন বৈশ্বিক কমিশন এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বিশ্ববাসী যা বুঝতে পারে না, তাকে তারা শাসন বা নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। এআই-এর সম্ভাবনা যেমন বিশাল, এর ঝুঁকিগুলোও তেমনই বাস্তব। আর এ বিষয়ে অপেক্ষা করার মাশুল দিন দিন বাড়ছে।”
এআই-এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা এবং এর নিরাপদ বিকাশের লক্ষ্যে বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতা ও জাতিসংঘের ডিজিটাল প্রযুক্তি সংস্থার সমন্বয়ে ‘এআই ফর গুড গ্লোবাল কমিশন’ নামে নতুন একটি প্যানেল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামে এবং সেলসফোর্স-এর (Salesforce) সিইও মার্ক বেনিওফ এই কমিশনের কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।