মুক্তমত বিভাগ
সাবেক উপদেষ্টাদের ‘বাংলো-বিলাস’ ও মব আতঙ্ক: ক্ষমতার মেকআপ ধুয়ে গেলে যা থাকে
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
অদ্ভুত এক সমীকরণ! ক্ষমতায় থাকার সময় যারা মব বা জনতাকে তোয়াক্কাই করেননি, আজ সেই জনতার ভয়েই তারা সরকারি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন।
যখন মব আতঙ্কে সাবেকরা ‘গৃহবন্দী’ হতে চান: ক্ষমতা গেলে মানুষের কত কী যায়! কারো যায় ঘুম, কারো যায় হম্বিতম্বি, আর আমাদের দেশের সাবেক উপদেষ্টাদের যাচ্ছে প্রাণের চেয়েও প্রিয় ‘সরকারি বাংলো’। সম্প্রতি জানা গেল, সাবেক সরকারের উপদেষ্টারা সরকারি বাসভবন ছাড়তে নারাজ। তাদের যুক্তি হলো ‘মব আতঙ্ক’। অদ্ভুত এক সমীকরণ! ক্ষমতায় থাকার সময় যারা মব বা জনতাকে তোয়াক্কাই করেননি, আজ সেই জনতার ভয়েই তারা সরকারি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। একেই কি বলে ‘পাবলিক রিঅ্যাকশন’ থেকে বাঁচতে ‘পাবলিক প্রপার্টি’ আঁকড়ে ধরা?
“আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’।”
তবে আমাদের সাবেক উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রে উল্টো। তারা বাইরে মেঘ (জনতা) দেখলে ঘরের ভেতর ঢুকে এসি ছেড়ে বসে থাকতে চান। সরকারি বাংলোর একেকটা ইট যেন তাদের কাছে একেকটা রক্ষাকবচ। তারা ভাবছেন, গেটে একটা সরকারি নেমপ্লেট ঝুলে থাকলে হয়তো ক্ষুব্ধ জনতা ভাববে— ‘আরে, এরা তো এখনো আমাদেরই লোক, এদের ডিস্টার্ব করা যাবে না।’
কিন্তু আসল সত্যটা কি শুধু আতঙ্ক? নাকি ওই পশমি কার্পেট, ডাইনিং টেবিলের রাজকীয় আভিজাত্য আর বিনা ভাড়ার বিলাসী জীবনের মায়া? যে গদিতে বসে তারা এতদিন দেশ ও জনগণের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন (কিংবা করেছেন বলে দাবি করেছেন), সেই গদি ছাড়তে গেলে তো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবেই। ক্ষমতা বিউটি পার্লারের মেকআপের মতো— ধুয়ে ফেললেই আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে। আর সেই মেকআপ ছাড়া চেহারা নিয়ে রাস্তায় নামতে কারই বা ভালো লাগে?
“বড় ভাইয়েরা রুম ছাড়ছেন না, তাই ছোট ভাইদের বারান্দায় রাত কাটাতে হচ্ছে।”
মজার ব্যাপার হলো, বর্তমান সরকারে মন্ত্রী ও সদ্য সাবেক উপদেষ্টার সংখ্যা বাংলোর সংখ্যার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ সিট সংকটের কারণে নতুনদের এখন ‘ওয়েটিং লিস্টে’ থাকতে হচ্ছে। ওদিকে সাবেকরা সিট ছাড়ছেন না। মনে হচ্ছে এটা যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো হলের গণরুম। বড় ভাইয়েরা রুম ছাড়ছেন না, তাই ছোট ভাইদের বারান্দায় রাত কাটাতে হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, এখানে বড় ভাইয়েরা সাবেক দাপুটে উপদেষ্টা আর ছোট ভাইয়েরা নতুন রাষ্ট্র সংস্কারক।
তবে উপদেষ্টাদের এই ‘মব আতঙ্ক’ থিওরিটা বেশ ইন্টারেস্টিং। তারা হয়তো ভাবছেন, সরকারি বাসভবনের দেয়ালগুলো বুলেটপ্রুফ না হলেও ‘ঘৃণা-প্রুফ’। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, দেয়াল দিয়ে শরীর বাঁচানো যায়, দায়বদ্ধতা নয়। এতদিন যারা জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ এনেছেন, আজ তাদের সেই জোয়ারের পানিতেই ভেজার ভয় লাগছে?
“সাবেক উপদেষ্টাদের এই ‘বাংলো-বিলাস’ আসলে আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।”
গণতন্ত্রে ক্ষমতা আসা-যাওয়ার খেলা। কিন্তু আমাদের দেশের সংস্কৃতি হলো, ক্ষমতায় গেলে মনে হয় এটা পৈতৃক সম্পত্তি, আর ক্ষমতা ছাড়ার সময় মনে হয় এটা যেন দীর্ঘমেয়াদী লিজে নেওয়া কোনো দোকান। সাবেক উপদেষ্টাদের এই ‘বাংলো-বিলাস’ আসলে আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
পরিশেষে বলি, মাননীয় সাবেকগণ, মব আতঙ্কের চেয়েও বড় আতঙ্ক হলো ইতিহাসের আস্তাকুঁড়। বাংলো ছাড়লে বড়জোর ফুটপাতে দাঁড়াতে হবে, কিন্তু সততা আর নৈতিকতা আগেই ছেড়ে দিলে দাঁড়ানোর মতো কোনো জমিও অবশিষ্ট থাকে না। তাই মায়া কাটান, ব্যাগ গোছান। জনগণ আপনাদের ‘কর্ম’ মনে রাখলে বাংলোর দেয়াল কোনোদিন আপনাদের বাঁচাতে পারবে না। আর যদি ভালো কাজ করে থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের কুঁড়েঘরেও আপনাদের ঠাঁই হবে।
আপাতত নতুনদের জন্য চাবিটা রেখে বিদায় হওয়াই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়? নাকি ‘মব’ আসার আগেই ‘মব’ নাম দিয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকাই এখনকার নতুন পলিটিক্যাল ট্রেন্ড? উত্তরটা অবশ্য সময়ের হাতেই তোলা থাক।
“যেখানে যুক্তি শেষ, সেখানেই স্যাটায়ারের শুরু…মুখোশ উন্মোচনে আমরা আপসহীন।”
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই বিভাগের সমস্ত লেখা নিছক স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক। এর উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অসঙ্গতিগুলোকে কৌতুকের ছলে তুলে ধরা। ঘটনা বা চরিত্রের সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা নিতান্তই তাদের ‘কর্মফল’ হিসেবে গণ্য হবে।





