শৈলেন কুমার দাশ
নয়নাবিরাম ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশে আগস্টের ২৭ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত কেলগেরি নগরের অতি আকর্ষনীয় সবুজ শ্যামল গালিচায় সাজানো স্প্রুস মিডোজ-এ সম্পূর্ণ এক নতুন রুপে ও আঙ্গিকে গ্লোবাল ফেস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। অসাধারণ এই আয়োজনে প্রতি রাতের আকাশ সেজে উঠেছিল আন্তর্জাতিক আবরণে সাজানো আতশবাজির আলপনার মুগ্ধময় আলোর রংগে রংগে। সাংস্কৃতিক প্যাভিলিয়নগুলো সেজেছিল টোকিও থেকে ওয়াল ষ্ট্রীটের সংগীতের সুরের মূর্চনায়। সেইসাথে ৬০০টি ড্রোনের একটি আলোক প্রদর্শনী রাতের আকাশকে নিয়ে গিয়েছিল এক স্বপ্নসম স্নিগ্ধ আলোর সাজানো জগতে। সুবিস্তৃত আকর্ষণীয় সবুজের সমারোহ আর উন্নত পরিকল্পনায় সাজানো এই নতুন স্থানটি আরও বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধর পরশ জোগায় দর্শনার্থীদের মধ্যে।
নয়ন মুগ্ধকর গ্লোবাল ফেস্ট এর এই আসরে পাইরো-মিউজিক্যাল এবং সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় তিনটি প্রদর্শনী দেশ তথা জাপান, মেক্সিকো ও ইটালী অংশগ্রহণ করেছিল। অসাধারণ এক নৈপূণ্য ও পারদশর্শিতার ছাপ ছিল অনুষ্ঠানের পরতে পরতে। যা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হাজার হাজার মানুষের মনে সুরের আর আলোর রংগের ঝর্ণা ধারার মায়াবী পরশ জড়িয়ে যায় ক্ষণতরে স্বর্গীয় এক আলোর রংগে। পাইরো-মিউজিক্যাল হলো এক ধরনের মনোমুগ্ধকর আতশবাজির প্রদর্শনী, যা সুর ও সঙ্গীতের সাউন্ডট্র্যাকের সাথে কোরিওগ্রাফ করা এবং নিখুঁতভাবে সমন্বিত করে উপস্হাপন করা হয়। সুরের ছন্দ মিশে যায় চঞ্চল আলোর নৃত্যের সাথে সাথে। আঁধার রাতের আকাশে স্বপ্নলোকের হাসি জড়ায় সুরে ও গানের ছন্দের তালে তালে।
আগেই বলেছি স্প্রুস মিডোজ-এ অনুষ্ঠিত এই প্রাণোহরা উৎসবের জন্য নির্বাচিত দেশগুলো ছিল জাপান, মেক্সিকো এবং ইতালি। চার রাতব্যাপী এই অনুষ্ঠানে একাধিক দেশের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান মালার পরিবর্তে একটি চূড়ান্ত “গ্লোবাল ফিনালে” শেষ সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয়েছিল। যা অনন্য এক স্বপ্নীল মুগ্ধতা ছড়িয়েছিল প্রাণে প্রাণে। গ্লোবাল ফেস্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এর জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করবে।
থিমযুক্ত বা উপজীব্য বিষয়কে ধারণ করে রাতের আসর সেজেছিল মূল প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী তিনটি দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সুরম্য আভরণে তথা জাপান (আগস্ট ২৭), মেক্সিকো (আগস্ট ২৮), ইতালি (আগস্ট ২৯) এবং একটি গ্লোবাল ফিনালে (আগস্ট ৩০) আলোর প্রদর্শনীতে। আলোর বন্যায় আকশকোণে স্হাপিত হয় ঝর্ণাধারা।অনুষ্ঠানের প্রতি রাতে প্রায় ৯:৩০টা থেকে পাইরো-মিউজিক্যাল আতশবাজি এবং আলবার্টার সর্ববৃহৎ ৬০০-ড্রোনের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা এক স্নিগ্ধময় সম্মোহনী আবেশ জড়ায় প্রাণে প্রাণে।
পাশাপাশি সুবিশাল এই শান্ত অঙ্গন জুড়ে হেসেছিল মিলনের উৎসব। হাজারও মানুষের হাসি, আনন্দ, প্রাণের স্পন্দন, আর শত আয়োজনে মূখরিত হয়েছিল শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই নীরব প্রান্তর। আন্তর্জাতিক খাবারের দোকান, সাংস্কৃতিক প্যাভিলিয়ন, লাইভ মিউজিক, নাইট মার্কেট এবং পারিবারিক খেলার মঞ্চ এই আয়োজনকে আপন করে সাজিয়েছিল আগত অতিথিদের জন্য। শিশু, কিশোর, আবাল বৃদ্ধ, বনিতা সবাই সেজেছিল মিলনের অভূতপূর্ব মানবিকতার অপূর্ব সুন্দর রংগে। আর অর্ধ কিলোমিটার দূরত্বে এই অঙ্গনের উত্তরে ও দক্ষিণে স্হাপিত টিডি ব্যাংক মিউজিক স্টেজ ও এয়ার কানাডা মিউজিক স্টেজ থেকে ভেসে এসেছে হৃদয়ছোঁয়া কথা ও বাণীর সুর মেশানো বিখ্যাত সব গানের কলি। যা পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ পৃথিবীর সমস্ত সুর ও বাণীকে একই মঞ্চে নিয়ে এসেছিল। আর মন ছুঁয়েছে হাজারও শ্রোতার। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের বিখ্যাত সেই গানের কলি যেন সুরে সুরে অনুরণন হয়েছে অগণিত শ্রোতার মনে- “সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে আমায় ছুঁইয়াছিলে।”
বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন সেজে উঠেছিল বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকজ শিল্প, নকশী কাঁথা, শাড়ী, গহনা ও অলংকারের বাহারী রংগের মনোহরা সৌন্দর্য্যে। আর যাদের হাতের নিপুণ স্পর্শে আবহমান বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে সেজে উঠেছিল এই আকর্ষণীয় প্যাভিলিয়ন তাঁরা হচ্ছেন বাংলাদেশী সোসাইটি অব কেলগেরি (বিএসসি) ‘র সদস্যবৃন্দ। ঢেঁকি, হাত পাখা, রিকশা, ঠেলাগআড়ি, মাছ ধরার পলো, খলই, হারিকেন, নকশী কাঁথা, তাঁতের শাড়ী ইত্যাদি ছিল অতিথিদের আকর্ষণের বিষয়বস্তু। এসব প্রদর্শনীকে ঘিরে আগত অতিথিদের হরেক প্রশ্নের উত্তর প্রদানে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন প্রত্যেক সদস্য। যাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, উপস্হাপনা ও বর্ণনা শৈলী অতিথিদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে তাঁরা হলেন, হাসান আব্বাস, ওবায়দুর রহমান, শৈলেন কুমার দাশ, নাফিজা বেগম, শাহানারা খাতুন, শান্তা নওরীণ, জামাল উদ্দিন, মাহমুদুল হক ও আরো অনেকে।
এই অঙ্গন জুড়ে সেই সংস্কৃতির এক মনোজ্ঞ আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যার প্রকাশ ঘটেছে দার্শনিক ও বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতির অতি সুন্দর আলাপনে। সংস্কৃতিকে তিনি এইভাবে উপস্হাপন করেছেন, “কথায় মাধুর্য্য, চোখে প্রীতির প্রভা, কর্মে কল্যাণবোধের ব্যঞ্জনা, আর আচরণে সুরুচির সামগ্রিক লাবণ্যই সংস্কৃতি।” বাংলাদেশের আরেক পন্ডিত ও গুণীজন কাজী মোতাহের হোসেন বলেছেন, সংস্কৃতিবান হওয়া প্রেমবান হওয়ারই নামান্তর। সুন্দর মানবিক দর্শনে বিকশিত ও সজ্জিত মানুষ ক্রমাগত ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়ায় ভালোবাসা ও সুন্দরের পথ ধরে। সততা ও নৈতিকতার পূণ্যভূমি খুঁজে বেড়ায় নিরন্তর জীবনকে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিয়ে যাবার জন্য, সেই সংস্কৃতিবান। জগত বিখ্যাত আরেক সমাজ চিন্তাবিদ ম্যাক আইভার সংস্কৃতিকে অতি সরল ও সহজভাবে উপস্হাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা জীবনের সুন্দর চলার পথে কর্মের যে নান্দনিক আলপনা সাজাই তাই আমাদের সংস্কৃতি।
সুতরাং মাধুর্য্যপূর্ণ ও প্রসন্ন স্নিগ্ধতার পরশে সজ্জিত জীবন যা প্রীতিময় মানবিক কর্মের পথ ধরে বিকশিত হয় তাই হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষের মনে সুন্দরের জন্ম দেয়, নান্দনিকতার জন্ম দেয়, যার উপস্হিতি হৃদয়ছোঁয়া এক উষ্ণ অনুভূতির জন্ম দেয় প্রাণের কোণে। সুন্দরের দেদীপ্যমান আলোর ধারায় প্রাঞ্জল মন কল্যাণের পথে অগ্ৰসর হয়ে শুভকর্মের সুচনা করে। মনের কোণে মঙ্গল ও কল্যাণের অনুরণন সে শুনতে পায়। জীবনে শুভ ও সুন্দর প্রতিস্থাপনের জন্য যে আকুল হয়, সেই সংস্কৃতিবান।
এই কথাগুলো বলার কারণ হল, এই বিশাল আয়োজনের পথে পথে ছিল এমনই সুন্দরের সমারোহ। আর বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন ছিল সেই নান্দনিক কর্মের বাহারে সাজানো পরম মমতায়। এ যেন নবধারা জলে পূণ্যস্নান শেষে শুভকর্মের পথে এক নবীন যাত্রা মহা আয়োজনে।
বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নকে আকর্ষণীয় করে তোলে ওয়েডিং ফটোশুট গ্যালারি। কানাডিয়ান ও বিভিন্ন দেশের ইমিগ্রান্টরা নববধূ ও বরের সাজে ফটো তোলার জন্য গভীর আগ্ৰহ, আনন্দ উচ্ছাসের সাথে মৃদু হাসি হেসে আমন্ত্রণ জানানোর সাথে সাথেই এগিয়ে আসেন। আমি নিজ মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় যাদের ফটো তুলেছি তাঁরা হলেন গিলান ও লিসা, নোলান ও শেরি, আনিক ও অ্যালান, লিন ও মর্টেন্সেন,
অরল্যান্ডো ও ভেরোনিকা, তেরেসা ও তাঁর পুত্র, সারাহ ও রান্ডিন, শন ও এরিন, রেনা ও তাঁর পুত্র, ম্যাট ও সুসান
চ্যান্টাল ও কোরবেন, মেঘান ও রবি, পোলিনা ও ওলেক্সান্ডার, নিক ও কারমেন, এরিক ও লরা প্রমুখ। ধন্য গ্লোবাল ফেস্ট, ধন্য বাংলাদেশ সোসাইটি অব কেলগেরি যাদের অমিয় সুন্দর মিলন উৎসবের মাধুর্য্য বেঁধে দিয়েছিল বিভিন্ন ভাষা, সংস্কার, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষকে একই বৃন্তের নিবিড় বন্ধনে। এই মিলন উৎসব বার বার আয়োজিত হোক নবীন সৌরভে ও সুন্দরে মানবতা ও বিশ্বজনীন সংস্কৃতির অপার মহিমায়।
পরিশেষে রবিঠাকুরের বাণী ও সুরে বিদায় জানাই সুন্দর সংস্কৃতির প্রতিমা রূপ এই বৈশ্বিক উৎসবকে- “ভরা থাক, ভরা থাক স্মৃতি সুধায় বিদায়ের পাত্রখানি, মিলনের উৎসবে তার ফিরায়ে দিও আনি।”