ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। সোমবার সকালে ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এই চুক্তিতে সই করে। সময় ও পরিসর বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক তাড়াহুড়া হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও আইনবিশেষজ্ঞরা।
চুক্তির মূল অংশ হিসেবে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনা হচ্ছে, যার মোট মূল্য ৩.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট। রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বহরের সংকট নিরসনে এটিকে জরুরি বলে দাবি করা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চাপ মোকাবিলায় বহুবিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় দায়কে কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
অর্থনীতিবিদ ও আইনজ্ঞরা এই চুক্তিকে নীতির মৌলিক লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এতে দেশের প্রতিযোগিতা আইন উপেক্ষিত হয়েছে, জাতীয় কোষাগারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই চুক্তি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিমান কৌশলের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সফরের সময় ১০টি এয়ারবাস A350 কেনার সিদ্ধান্ত হলেও ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপ শুরু হয়। প্রথমে বাংলাদেশি রপ্তানির ওপর ৩৭ শতাংশ প্রতিশোধমূলক শুল্কের হুমকি দেওয়া হয়, যা আলোচনার পর ২০ শতাংশে নামানো হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে বাংলাদেশ তুলা আমদানি ও ২৫টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে চূড়ান্ত হওয়া ১৪টি বিমান সেই চুক্তির প্রথম ধাপ।
এই ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের ক্ষেত্রে সরকার নিজেই গ্যারান্টর হওয়ায় বিমান খেলাপি হলে দায় সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর পড়বে। যদিও বিমান ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৯.৩৭ বিলিয়ন টাকার নিট মুনাফার দাবি করেছে, নিরীক্ষকদের মতে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এখনো দুর্বল। বিমানের ঋণ-ইকুইটি অনুপাত প্রায় ৪:১, যেখানে শিল্পের মানদণ্ড ১.৫:১।
চুক্তির আওতায় কেনা বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স বিমানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। গত তিন বছরে এই মডেলের অন্তত চারটি দুর্ঘটনার তদন্ত চলমান।
বিশ্লেষকদের আরও দাবি, এই চুক্তি প্রতিযোগিতা আইন ২০১২-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাছাড়া চুক্তির অর্থ পরিশোধের দায় পড়বে আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর, অথচ কোনো বিমানই বর্তমান সরকারের মেয়াদে আসবে না। সবকিছু ঠিক থাকলে বিমানগুলো দেশে আসবে ২০৩১ সালের অক্টোবরের পর।





