আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এটি তার শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। তাই শেষ বাঁশির পর নেইমারের কান্না শুধু একটি ম্যাচে হারের হতাশা নয়, বরং বিশ্বকাপ জয়ের আজীবনের স্বপ্ন অধরা থেকে যাওয়ার বেদনাও হয়ে উঠেছে।
ফুটবল বিশ্বে আরও একটি সোনালী অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি ঘটল। ২০২৬ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলের অপ্রত্যাশিত হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রাজিলের আইকন এবং ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র। এর মধ্য দিয়ে সেলেসাওদের জার্সিতে এক বর্ণিল, ঘটনাবহুল ও আবেগময় ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা।
বিদায়বেলার বিষাদময় বার্তা ও মেটলাইফ কানেকশন:
————–
ইতালির প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি ব্রেকিং নিউজের মাধ্যমে নেইমারের এই অবসরের খবরটি নিশ্চিত করেন। রোমানোর পোস্টে উঠে আসা নেইমারের বিদায়ী বার্তাটি ছিল চরম আবেগঘন:
“আমি চেষ্টা করেছিলাম, আমি সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম। এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর আজ এখানেই আমি শেষ করলাম। সবকিছু এখন শেষ।”
পরিসংখ্যান ও ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল তরুণ নেইমারের। নিয়তির অদ্ভুত চক্রে, ১৬ বছর পর সেই একই মাঠে দাঁড়িয়ে তাকে হতাশার বিদায় নিতে হলো।
২০২৬ বিশ্বকাপ: ইনজুরি, সাইডলাইন ও শেষ লড়াই:
————–
চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে নেইমারের যাত্রাটা মোটেও সুখকর ছিল না। ফিটনেস সমস্যা ও ইনজুরির কারণে কোচ তাকে শুরুর একাদশে নিয়মিত রাখতে পারেননি। পুরো আসরে মাত্র দুটি ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ পান তিনি।
গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার পর, দ্বিতীয় রাউন্ডে নরওয়ের বিপক্ষে দলের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও তাকে বেঞ্চ থেকে শুরু করতে হয়। নরওয়ের কাছে পিছিয়ে পড়া অবস্থায় মাঠে নেমে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে টুর্নামেন্টে নিজের একমাত্র গোলটি করেন নেইমার। কিন্তু তার সেই গোলটি ব্রাজিলের হার এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। নেইমারের বিদায়ের দিনে ব্রাজিলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে নরওয়ে।
পরিসংখ্যানের পাতায় নেইমার: এক অসামান্য অধ্যায়:
————–
বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন অধরা থাকলেও, ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের ব্যক্তিগত অর্জন এবং অবদান অনস্বীকার্য।
সর্বোচ্চ গোলদাতা: সেলেসাওদের জার্সিতে ১২৯টি ম্যাচ খেলে রেকর্ড ৮০টি গোল করেছেন তিনি, যা পেলেকে ছাড়িয়ে তাকে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে।
অলিম্পিক গৌরব: দেশের হয়ে দুটি অলিম্পিকে অংশ নিয়ে তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে রৌপ্য পদক জয়ের পর, ২০১৬ সালে ঘরের মাঠ রিওতে তার নেতৃত্বেই ব্রাজিল তাদের কাঙ্ক্ষিত ও ঐতিহাসিক অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয় করে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে: ২০১০ সালে অভিষেকের পর থেকে তিনি দেশের হয়ে মোট চারটি বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এক যুগের অবসান:
————–
ব্রাজিলীয় ফুটবলে ‘জোগো বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের অন্যতম ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হতো নেইমারকে। তার স্কিল, ড্রিবলিং এবং মাঠের ভেতরের সৃজনশীলতা যুগের পর যুগ ভক্তদের মুগ্ধ করেছে। নরওয়ের বিপক্ষে এই হারের রাতটি তাই শুধু ব্রাজিলের বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের রাত নয়; বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা এক তারকার আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে চিরবিদায়ের রাত হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।