বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | লন্ডন ও আন্তর্জাতিক দপ্তর।
ব্রিটেনে রাজতন্ত্র হটিয়ে শরিয়া আইন চালুর প্রকাশ্য ডাক: তীব্র বিতর্কের মুখে সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রচারক মিজানুর রহমান
লন্ডন ও নিউইয়র্কের মুসলিম মেয়রদের ‘আসল মুসলিম নয়’ বলে দাবি এবং উগ্র ভিডিও বার্তায় তোলপাড়; নেপথ্যে নিষিদ্ধ আইএস নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতা ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন সংকট।
লন্ডন, ৫ জুন, ২০২৬:
যুক্তরাজ্যের (ব্রিটেন) বুকে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও প্রচলিত আইনকানুনকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে পুরো দেশে কড়া শরিয়া আইন চাপিয়ে দেওয়ার এক প্রকাশ্য ও উগ্র দাবি তুলেছেন সাজাপ্রাপ্ত চরমপন্থী প্রচারক মিজানুর রহমান। যিনি ব্রিটেনের বিতর্কিত উগ্রবাদী ধর্মগুরু আনজেম চৌধুরীর প্রধান ডান হাত এবং অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ইউটিউব ও টিকটকের মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে হাতিয়ার বানিয়ে তিনি এই চরমপন্থী মতাদর্শের প্রচার চালাচ্ছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ নাগরিকের এমন উগ্র ও আক্রমণাত্মক প্রচারণার কারণে বর্তমানে ব্রিটেনের জাতীয় নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগে নতুন করে তীব্র তোলপাড় ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
উগ্রবাদের দীক্ষা এবং শুরুর ইতিহাস:
লন্ডনে জন্মগ্রহণকারী ৪৩ বছর বয়সী এই মিজানুর রহমান মূলত একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকেই উগ্রপন্থী সংগঠন ‘আল-মুহাজিরুন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ওমর বকরী মোহাম্মদ এবং পরবর্তীতে আনজেম চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে তিনি চরমপন্থী আদর্শে দীক্ষিত হন। পেশাগতভাবে একজন দক্ষ ওয়েব ডিজাইনার হওয়ায় তিনি এই নিষিদ্ধ সংগঠনের জন্য ইন্টারনেটে গোপন ফোরাম তৈরি ও আইটি সেক্টর দেখভাল করতেন।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে ডেনমার্কের দূতাবাসে মহানবী (সা.)-এর কার্টুন প্রদর্শনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় মার্কিন ও ব্রিটিশ সৈন্যদের হত্যার উসকানি দেওয়ার অপরাধে তার ৪ বছরের জেল হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালে ইরাক ও সিরিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস (ISIS)-এর প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন জোগানোর দায়ে আনজেম চৌধুরীর সাথে তাকে আবারও সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ডিজিটাল দুনিয়ায় ছদ্মনাম ও শরিয়া আইনের অদ্ভুত যুক্তি:
২০১৮ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মিজানুর রহমানের ওপর ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল প্রশাসন। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের মতে, তিনি কম্পিউটার প্রযুক্তিতে এতটাই পারদর্শী ছিলেন যে তাকে মূল দলনেতা আনজেম চৌধুরীর চেয়েও বড় সাইবার threat বা হুমকি মনে করা হতো। ২০২১ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘আবু বারা’ ছদ্মনাম ধারণ করে পুনরায় সক্রিয় হন।
সম্প্রতি একটি ইউটিউব আলোচনায় তিনি দাবি করেন যে, ব্রিটেনের বর্তমান ব্যবস্থা ভেঙে যদি শরিয়া আইন চালু করা যায়, তবে সমাজ থেকে মাদক, মদ ও অপরাধ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে এবং নারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। শুধু তাই নয়, তিনি এক অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে দাবি করেন যে ব্রিটেনের বর্তমান সংকটকবলিত জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বা এনএইচএস (NHS)-কে বাঁচাতে পারে একমাত্র ইসলামী শাসন ব্যবস্থা।
“ব্রিটেনের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একমাত্র শরিয়া আইন প্রবর্তনের মাধ্যমেই সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা এবং এনএইচএস-এর মতো রাষ্ট্রীয় সেবাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।”
— আবু বারা (ছদ্মনামে মিজানুর রহমান)
মুসলিম মেয়রদের প্রতি হুমকি ও তীব্র বিতর্ক:
মিজানুর রহমান তার ভিডিওতে লন্ডন ও নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মুসলিম মেয়রদের তীব্র সমালোচনা করে দাবি করেন যে, তারা নিজ নিজ শহরে শরিয়া আইন প্রবর্তন না করে বড় ধরনের অবিশ্বাসের কাজ করছেন। তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন যে, যেহেতু তারা ঐসব দেশের পশ্চিমা নিয়ম ও আইন মেনে চলছেন, তাই তারা আর ইসলামের অংশ নন। একই সাথে তিনি সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানান যেন এই মেয়রদের ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো হয়।
আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, ওই একই আলোচনায় তার সাথে যুক্ত থাকা অন্য এক চরমপন্থী প্রচারক দাবি করেন যে, যদি ব্রিটেনে শরিয়া আইন আসত, তবে সমকামীদের (LGBT) সমর্থন করার অপরাধে লন্ডনের বর্তমান মেয়র সাদিক খানকে সবার আগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। এই ধরনের বক্তব্য প্রকাশ পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যের মুসলিম কমিউনিটিসহ সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
আইনি ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে প্রতিক্রিয়া:
এই পুরো চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত ও জনসমক্ষে আসে ৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে। এবং বর্তমানে ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসেও ব্রিটেনে উগ্রবাদ দমন, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই প্রচারকদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং তাদের political বক্তব্যের আইনি পরিণতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা চলছে। British কাউন্টার-টেররিজম ইউনিট ইতিমধ্যেই এই ভিডিওর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট আইসিস (ISIS) নেটওয়ার্কের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এই ধরণের উগ্র বক্তব্য প্রচারের নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে হাউজ অব কমন্সে।
ভেরিফাইড ইনফরমেশন সোর্সেস (Verified Information Sources):
১. The Telegraph – Crime and Security Desk Report by Martin Evans.
২. London Metropolitan Police – Counter-Terrorism Operations Log.
৩. UK Ministry of Justice & Crown Prosecution Service Archive.