রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) তার পদত্যাগের পরপরই একটি প্রশ্নই জনমনে ঘুরে ফিরছে- কে হচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দেশের বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ চার নেতা। তারা হলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সার্বিক সমীকরণে দল ও দলের বাইরে পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে বিএনপি মহাসচিব ও বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সামাজিকমাধ্যমের আলোচনায় তাকেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
আলোচনায় তার নাম সামনে আসার পেছনে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শালীন ও সংযত রাজনৈতিক আচরণ, মার্জিত ব্যক্তিত্ব, পরিমিত ও সাবলীল বক্তব্য এবং বিরোধী মতের প্রতিও সম্মানজনক অবস্থানের জন্য পরিচিত। পাশাপাশি দলের সংকটময় সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ ও কারাবরণ, নেতাকর্মীদের প্রতি মানবিক ও আত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানও তার পক্ষে আলোচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে আসছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ধারাবাহিক অবস্থান, শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা এবং দেশ-বিদেশে তার গ্রহণযোগ্যতাও রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এগিয়ে রাখছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্যক্তিগত প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তিনটি বিষয়। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ। রাজনৈতিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতায় তিনি এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনায় উঠে আসাকে অনেকেই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় বিশ্বস্ততা, ধৈর্য ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি শুধু একজন মহাসচিব নন, বরং দুঃসময়ের নির্ভরযোগ্য কাণ্ডারি। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একজন সাদামাটা, সজ্জন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণিত অভিযোগ সামনে আসেনি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও তীব্র বিরোধের মধ্যেও শালীন ভাষা, সংযত বক্তব্য এবং মার্জিত আচরণ বজায় রাখার কারণে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছেও সম্মান অর্জন করেছেন।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক পর্বে দলের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি এবং বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে অবস্থানকালে মির্জা ফখরুল অত্যন্ত ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে দলের নেতৃত্ব দেন। এ সময় তিনি শত শত মামলা, একাধিকবার কারাবরণ এবং রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেও দলীয় কর্মসূচি পরিচালনা ও নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, জিয়া পরিবারের প্রতি তার অবিচল আস্থা, দলের প্রতি দীর্ঘদিনের নিবেদন, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত সততার ভাবমূর্তি তাকে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অন্যতম বড় শক্তি তার বিস্তৃত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির পদটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এ পদে এমন একজন ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন, যিনি রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে থেকে রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল সংলাপ, সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তিনি শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নেও তার অবস্থান তাকে বিভিন্ন মহলে গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
এ ছাড়া সুশীল সমাজ, পেশাজীবী মহল এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পেলে তার এই অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সহায়ক হতে পারে।
১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক একজন সাবেক শিক্ষক এবং অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য। ৭৯ বছর বয়সী এই নেতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধীরস্থির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অভিভাবকত্বের আসনে বসানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তুলেছে। মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বারী পদত্যাগ করার পর মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। তার বাবা মরহুম রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন কৃষি প্রতিমন্ত্রী। মির্জা ফখরুলও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি নতুন সরকার গঠন করলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইবে এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে, যিনি রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে শক্ত হাতে হাল ধরতে পারবেন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। মির্জা ফখরুল যেহেতু নিজে এবার নির্বাচন করে রাজনীতি থেকে অবসরের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন (সাম্প্রতিক কিছু জনসভায়), তাই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করাটা হবে তার দীর্ঘ ত্যাগের একটি যথাযোগ্য সম্মান। মির্জা ফখরুল কেবল বিএনপি মহাসচিব নন, তিনি বর্তমান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার মতো একজন মানুষকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা আরও বাড়াবে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একজন দক্ষ ও বিতর্কহীন রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব অপরিসীম। সেই মানদণ্ডে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেবল বিএনপির প্রথম পছন্দই নন, বরং সাধারণ মানুষের কাছেও এক আস্থার নাম।
তবে নতুন রাষ্ট্রপতি যিনিই হন না কেন, তাকে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাই সরকার, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। এরই মধ্যে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।