ব্রিকলেন নিউজ, লন্ডন: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে আসীন ব্যক্তির প্রতিটি শব্দ ও পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তব্যে তথ্যগত অসংগতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যের ভুল উপস্থাপনের কারণে একাধিকবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্কগুলোকে এক পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই; কারণ এর মধ্যে যেমন রয়েছে তাৎক্ষণিক শব্দগত ভুল, তেমনি রয়েছে পরিসংখ্যানগত বিতর্ক এবং বিকৃত তথ্য প্রচারের শিকার হওয়ার ঘটনাও।
শব্দগত ত্রুটি নাকি অসতর্কতা? গত ২২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর পরিবর্তে ‘প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি উচ্চারণ করে বসেন। যদিও তিনি পরক্ষণেই নিজের ভুল সংশোধন করে নেন, তবে মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এটিকে একটি সাধারণ ‘স্লিপ অব টাং’ বা তাৎক্ষণিক ভুল হিসেবে ধরা হলেও, প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এমন ভুল তার বক্তব্যের নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক তারেক রহমানের কিছু বক্তব্যের ঐতিহাসিক ও পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২৩ মে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ২০০৬ সালের পর থেকে সেখানে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জয়ন্তী উদযাপিত হয়নি। একই অনুষ্ঠানে তিনি ১৯১৪ সালে দারোগা রফিজ উল্লাহর মাধ্যমে কাজী নজরুলের ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে আসার ইতিহাস তুলে ধরেন।
এছাড়া নির্বাচনী প্রচারে ফরিদপুরকে সয়াবিন উৎপাদনের একটি বড় অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এর তথ্যগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশের সয়াবিন উৎপাদন মূলত উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চলকেন্দ্রিক। ফলে ফরিদপুর নিয়ে তার বক্তব্যটি যাচাইয়ের দাবি রাখে।
সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় সংসদে দেওয়া তার একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নিয়ে। তিনি দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ৩ এপ্রিল ‘ফ্যাক্টচেক জোন’ তাদের এক প্রতিবেদনে এই দাবির পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এটিকে বিভ্রান্তিকর ও প্রমাণবিহীন বলে উল্লেখ করে। অর্থনীতিবিদ ড. জাকারিয়া মাহমুদ এ বিষয়ে জানান, অর্থ পাচারের মতো জটিল হিসাবের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি; শনাক্ত করা অর্থ এবং সম্ভাব্য পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ এক নয়। তাই সংসদে এমন পরিসংখ্যান উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্যের উৎস ও হিসাবের পদ্ধতি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিকৃত তথ্যের শিকার ও ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ভূমিকা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের নির্ভুলতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক তেমনি তার নামে ভুয়া ও বিকৃত তথ্য প্রচারের ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি ‘পিআইবি’-এর ‘বাংলাফ্যাক্ট’ জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমান মেট্রোরেল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন—এমন একটি ভুয়া বক্তব্য ছড়ানো হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চালুর পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতি, ইতিহাস, অর্থনীতি ও জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম এবং প্রশাসন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা লাভ করে। তাই নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও সরকারি নথির ভিত্তিতে নির্ভুল তথ্য উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে, যেকোনো তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের মাধ্যমে তার সত্যতা যাচাই করাও বর্তমান সময়ের একটি বড় দাবি।