Skip to main content

Brick Lane News

লেমুর পাচার: আম্বানি পরিবার ও ভান্তারার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি

লেমুর পাচার: আম্বানি পরিবার ও ভান্তারার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি

ব্রিকলেন নিউজ-

বাংলাদেশ থেকে বিপন্ন প্রজাতির রিং-টেইলড লেমুর চুরি ও ভারতে পাচারের ঘটনায় ভারতের ধনাঢ্য আম্বানি পরিবারের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পায়নি তদন্তকারী সংস্থা। একই ঘটনায় ভারতের গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র ভান্তারার সংশ্লিষ্টতারও প্রমাণ মেলেনি বলে জানা গেছে। তদন্তের বর্তমান পর্যায়ে পাচারকারী চক্রের সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন তদন্তকারীরা।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি রিং-টেইলড লেমুর চুরি হয়। এর মধ্যে একটি পরে ঢাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়। বাকি দুটি লেমুর ভারতে পাচার করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ ঘটনায় আটজনকে অভিযুক্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, চুরি হওয়া দুটি লেমুর বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করে বিক্রি করা হয়েছে। তদন্তকারীরা প্রাণী দুটির অবস্থান ভারতের গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত ভান্তারায় শনাক্ত করার পর সেগুলো গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া লেমুর কি না, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন।

এ জন্য প্রাণী দুটির ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহ ও পরীক্ষার বিষয়টি সামনে আসে। তবে গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে লেমুরগুলোর আগের কোনো ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষিত না থাকায় পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে পাচার হওয়া লেমুর দুটি আম্বানি পরিবারের প্রতিষ্ঠিত ভান্তারায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে তদন্তকারীরা লেমুর চুরি কিংবা অবৈধ পাচারের সঙ্গে আম্বানি পরিবারের কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাননি বলে জানা গেছে।

ভান্তারা কর্তৃপক্ষও তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তারা এ বিষয়ে কোনো তদন্তকারী সংস্থার কাছ থেকে নোটিশ বা আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পায়নি। তাদের দাবি, ভারতের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধান মেনেই তারা প্রাণী সংগ্রহ করে।

ভান্তারার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিটি প্রাণীর প্রয়োজনীয় নথিপত্র রয়েছে এবং সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের জন্য তারা প্রস্তুত। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাছে থাকা রিং-টেইলড লেমুরগুলোর পরিচয় বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে। এ বিষয়ে আইনসম্মত যেকোনো অনুরোধে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে তারা।

তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি অনুযায়ী, পাচারকারী চক্রের কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণীগুলোর ভান্তারায় পৌঁছানোর বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে প্রাণী দুটি বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া লেমুর কি না, তা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ নিখোঁজ দুটি লেমুর উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে প্রাণীগুলোর পরিচয় ও উৎস নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত নথিপত্র এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকায় এ প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, প্রাণীগুলোর আগের ডিএনএ রেকর্ডের সঙ্গে নতুন করে সংগ্রহ করা নমুনার তুলনা করলে তাদের পরিচয় নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। কিন্তু গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ লেমুরগুলোর কোনো পুরোনো ডিএনএ রেকর্ড নেই।

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, জিনগতভাবে সম্পর্কিত আরেকটি লেমুরের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে নিখোঁজ প্রাণীগুলোর পরিচয় শনাক্ত করার বিকল্প উপায় পাওয়া যেতে পারে।

এদিকে, চুরির ঘটনার প্রায় এক মাস পর ঢাকার একটি আবাসিক ভবন থেকে উদ্ধার করা লেমুরটি পরবর্তী সময়ে মারা যায়। তারেক রহমানের ধারণা, দীর্ঘদিন একাকী থাকার কারণে প্রাণীটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তিনি জানান, লেমুর অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী এবং সাধারণত দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। তবে প্রাণীটির মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে লেমুর চুরি ও পাচারের ঘটনা বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বৈজ্ঞানিক নথিপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিপন্ন প্রাণীদের মাইক্রোচিপ সংযুক্ত করা, নিয়মিত ডিএনএ রেকর্ড সংরক্ষণ, সিসিটিভি নজরদারি জোরদার এবং সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানার কর্মীদের নিয়োগের আগে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার প্রতিরোধে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। লেমুর পাচারের এই ঘটনা দেখিয়েছে, বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সুরক্ষায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি প্রাণীগুলোর পরিচয় ও উৎস শনাক্ত করার জন্য নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক নথিপত্র সংরক্ষণও অপরিহার্য।