সুশান্ত দাস গুপ্ত, ব্রিকলেন, লন্ডন:
পদার্থবিজ্ঞানে এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া আমেরিকান বৈজ্ঞানিক ফ্রান্সিস হালজেন। কিন্তু কী এমন করেছেন তিনি? কঠিন বৈজ্ঞানিক ভাষা বাদ দিয়ে একেবারে সহজ করে গল্পের ঢংয়ে বুঝানোর চেষ্টা করছি তার অবদান।
মনে করুন, আমাদের চারপাশে সব সময় কোটি কোটি অদৃশ্য ‘ভূত’ ছুটে বেড়াচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এদের বলেন ‘নিউট্রিনো’। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
এরা সত্যিকারের ভূত নয়, অতি ক্ষুদ্র এক ধরনের কণা। এদের দেখা যায় না, অনুভবও করা যায় না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এরা আপনার শরীর, ঘরের দেয়াল, মাটি, এমনকি গোটা পৃথিবীর ভেতর দিয়েও চলে যেতে পারে। আপনি কিছুই টের পাবেন না।
সূর্য থেকেও প্রচুর নিউট্রিনো পৃথিবীতে আসে। কিন্তু ফ্রান্সিস হালজেনের আগ্রহ ছিল আরও রহস্যময় কিছু নিউট্রিনো নিয়ে। এগুলো আসে মহাকাশের বহু দূরের ভয়ংকর সব ঘটনা থেকে। কোথাও হয়তো বিশাল কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়েছে, কোথাও ব্ল্যাক হোলের আশপাশে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটছে। সেই সব ঘটনা থেকে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে নিউট্রিনো ছুটে আসে পৃথিবীর দিকে।
সমস্যা একটাই। যে জিনিস সবকিছুর ভেতর দিয়ে চলে যায়, তাকে ধরবেন কীভাবে?
হালজেনের মাথায় এল অদ্ভুত এক বুদ্ধি। তিনি বললেন, এদের ধরতে হলে বিশাল একটা ফাঁদ বানাতে হবে। আর সেই ফাঁদ বসাতে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জন জায়গাগুলোর একটিতে, দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে।
অ্যান্টার্কটিকার বরফের প্রায় আড়াই কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত গর্ত করা হলো। বিশাল এলাকাজুড়ে বরফের নিচে বসানো হলো হাজার হাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোক-সেন্সর। পুরো ব্যবস্থাটির নাম দেওয়া হলো ‘আইসকিউব’।
এখন প্রশ্ন হলো, এই যন্ত্র নিউট্রিনো ধরবে কীভাবে?
ধরুন, কোটি কোটি নিউট্রিনো বরফের ভেতর দিয়ে চলে গেল। প্রায় সবগুলোই কোনো চিহ্ন না রেখে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে কোনো একটি নিউট্রিনো বরফের ভেতরের কোনো কণার সঙ্গে ধাক্কা খেলে তার ফলে তৈরি হতে পারে অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী নীলচে আলোর ঝলক। বরফের নিচে বসানো হাজার হাজার ‘ডিজিটাল চোখ’ সেই আলো ধরে ফেলে।
ব্যস, ভূত সরাসরি ধরা পড়ল না, কিন্তু ভূত যে ওই পথ দিয়ে গেছে, তার চিহ্ন ধরা পড়ে গেল!
ব্যাপারটা অনেকটা এমন, আপনি চোরকে দেখেননি, কিন্তু ভেজা মেঝেতে তার পায়ের ছাপ দেখে বুঝে গেলেন, কেউ একজন এইমাত্র এখান দিয়ে গেছে।
২০১১ সালের দিকে আইসকিউব পুরোপুরি চালু হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা সত্যিই অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনোর সংকেত পেতে শুরু করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব নিউট্রিনোর কিছু পৃথিবীর কাছাকাছি কোনো উৎস থেকে নয়, বরং আমাদের ছায়াপথের বাইরের গভীর মহাকাশ থেকে এসেছে।
এর ফলে মহাবিশ্বকে দেখার জন্য বিজ্ঞানীরা যেন নতুন এক জোড়া চোখ পেলেন।
আগে আমরা মহাকাশকে মূলত আলো, রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে ইত্যাদির মাধ্যমে দেখতাম। এখন নিউট্রিনোকেও বার্তাবাহক হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। অর্থাৎ মহাকাশের বহু দূরে কোনো ভয়ংকর ঘটনা ঘটলে সেখান থেকে ছুটে আসা এই অদৃশ্য কণাগুলো আমাদের কাছে সেই ঘটনার খবর নিয়ে আসতে পারে।
ফ্রান্সিস হালজেনের বড় কৃতিত্ব এখানেই। তিনি শুধু একটি ধারণা দেননি। পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর বরফের নিচে প্রায় এক ঘন কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিশাল এক বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরির নেতৃত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্বের এই অদৃশ্য ‘ভূতদের’ পিছু নিয়েও মহাকাশের রহস্য জানা সম্ভব।
সহজ ভাষায় বললে, মানুষ এতদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে মহাবিশ্বকে দেখত। হালজেন দেখালেন, মহাবিশ্বের খবর জানতে কখনো কখনো আকাশের দিকে নয়, পৃথিবীর বরফের কয়েক কিলোমিটার নিচেও তাকাতে হয়।
আর সেখানেই লুকিয়ে আছে এই গল্পের আসল সৌন্দর্য।