নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রিকলেন নিউজ
ঢাকা: সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ সরকার এবং যুক্তরাজ্য ও ভারতের শীর্ষ কূটনীতিকদের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। একদিকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসন রোধ ও নিরাপদ শ্রম অভিবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনে বাংলাদেশ শীর্ষ পাঁচে: ফেরতে মিলবে আর্থিক সহায়তা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। বৈঠকে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন এবং অনিয়মিত অভিবাসনের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ পাঁচে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের করা এসব আবেদনের খুব সামান্য অংশই অনুমোদন পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকার ও জনগণের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। তবে, যাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তারা যদি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসতে চান, তবে তাদের পুনর্বাসনের জন্য ৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
নিরাপদ অভিবাসন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে যৌথ উদ্যোগ অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধের পাশাপাশি বৈধ ও নিরাপদ শ্রম অভিবাসন নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সারাহ কুক আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এছাড়া ‘গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন মাইগ্রেশন’ বাস্তবায়ন এবং মানবপাচার রোধে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে জানান, যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশগুলোতে মানসম্পন্ন জনশক্তি রপ্তানি এবং মানবপাচার রোধে ঢাকা-লন্ডন যৌথভাবে কাজ করবে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক: সম্ভাব্য সফর ও প্রত্যর্পণ ইস্যু এদিকে, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ভারত বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় সফরেরও একটি আমন্ত্রণ রয়েছে। তবে কোন আমন্ত্রণটি গ্রহণ করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বৈঠকে ভারতের কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটিও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছে এবং এ বিষয়ে নয়াদিল্লির ইতিবাচক সাড়ার প্রত্যাশা করছে ঢাকা। পাশাপাশি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের চাওয়া প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র হস্তান্তর করা হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার দেওয়া সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়েছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে। গঙ্গা চুক্তির মতো সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এটি মূলত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল, তাই নির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
সারসংক্ষেপ ও বিশ্লেষণ একদিকে যুক্তরাজ্যের কঠোর অভিবাসন নীতির পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরির সুযোগ, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত প্রত্যর্পণ ইস্যু এবং শীর্ষ পর্যায়ের সফর নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনীতি বহুমুখী সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার একদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে শ্রমবাজার ও অভিবাসন নীতি সুসংহত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আইনি প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।