বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত দুই শিশুর মৃত্যুর তথ্য মিললেও স্থানীয়দের দাবি, গত দুই সপ্তাহে অন্তত আট শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, টিকার ঘাটতি ও সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
রুমার দুর্গম রেমাক্রী প্রাংসা এলাকার বাসিন্দা মেনরুত ম্রো চার সন্তানের জনক। হামের প্রাদুর্ভাবে তার এক সন্তান মারা গেছে, আর বাকি তিন সন্তানও একই রোগে আক্রান্ত হয়। সন্তানদের বাঁচাতে তিনি দ্রুত তাদের হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালে আট দিন ধরে সন্তানদের পাশে রয়েছেন তিনি।
মেনরুত ম্রো বলেন, গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এক সন্তানকে হারানোর শোকের মধ্যেই বাকি তিন সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসতে হয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ায় তারা এখন আশঙ্কামুক্ত।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, হামের উপসর্গ নিয়ে বর্তমানে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন এবং বান্দরবান সদর হাসপাতালে ৩৬ জন শিশুসহ মোট ৪১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। অন্যদিকে রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, গত ৩ জুন থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত সেখানে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৯৯ জন শিশু।
রুমা উপজেলার লেতংখুমী পাড়া, লুথংসে গ্রাম, রেমাক্রী প্রাংসাসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। এসব এলাকায় পৌঁছাতে মোটরসাইকেলে নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত গিয়ে এরপর তিন থেকে চার ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হয়। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান কার্যক্রম কিংবা জরুরি চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই পৌঁছাতে পারে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম গ্রামগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি খুবই সীমিত। অনেক শিশুই টিকা পায়নি। দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, হামের উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রেলেএং খুমী (৫), খ্রেপা খুমী (১১), শইফ্রা খুমী (৫), প্রেটেম এং খুমী (৬), পলিএং খুমী (৯), প্রেটেমএং খুমী (৭), পও এং খুমী (৭) এবং কুপাও ম্রো (১৩)।
স্থানীয় বাসিন্দা অংসাই খুমী জানান, গত ১৫ দিনে একই ধরনের উপসর্গে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আরেক বাসিন্দা শৈলু খুমীর ভাষ্য, গ্রামে টিকা ও স্বাস্থ্যসেবা না পৌঁছানোয় মানুষ চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। অনেক পরিবার অর্থাভাবে হাসপাতালে আসতেও পারছে না।
গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেনরত ম্রো জানান, তার ইউনিয়নের অংলাই ম্রো পাড়ায় গত ২১ জুলাই কুপাও ম্রো নামে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর হামের উপসর্গে মারা যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবান সদর হাসপাতাল ও রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বেড়েছে। বেডের পাশাপাশি অনেক রোগী মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। অনেক শিশুর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা গেছে।
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল হাসান বলেন, গত জুনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৯ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. শাহিন হোসাইন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সদর হাসপাতালে ৩৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সরকারি হিসাবে হামের উপসর্গে দুই শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই দুর্গম এলাকায় নিজ বাড়িতে অথবা হাসপাতালে আনার পথেই মারা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্গম এলাকায় বিশেষ স্বাস্থ্য টিম পাঠানো হয়েছে এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।