বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে এই উৎপাদন হ্রাসের হার ক্রমাগত বাড়ছে, যা চাঁদপুরসহ সারা দেশের মৎস্যখাতে এক বড় ধরনের শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে সারা দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৬৫ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে শুধু চাঁদপুরেই উৎপাদিত হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই উৎপাদন কমে সারা দেশে ৫ দশমিক ২৯ লাখ এবং চাঁদপুরে ৩২ হাজার ৩০৪ মেট্রিক টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশজুড়ে উৎপাদন কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। এই কমার ধারাবাহিকতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সারাদেশে ইলিশ উৎপাদন কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে এসে ঠেকেছে।
উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা ইলিশের জীবনচক্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২২ সালে ইলিশের ডিম উৎপাদনের হার ছিল ৮ লাখ ৫ হাজার ৫১৫ কেজি, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে। রেণু পোনা থেকে জাটকা তৈরির হারও আনুপাতিক হারে কমেছে। ২০২২ সালে ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি জাটকা উৎপাদিত হলেও ২০২৫ সালে তা কমে ৩৯ হাজার ৫৭৮ কোটিতে নেমে এসেছে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এখন ইলিশ কেনা বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। বাজারদর এতটাই বেড়েছে যে, ক্ষেত্রবিশেষে চার কেজি গরুর মাংসের দামেও এক পিস ইলিশ কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতেও এর প্রভাব পড়েছে। আরেক তথ্যে দেখা যায়, ইলিশের ডিম উৎপাদন, রেণু পোনার হার ও জাটকা বেঁচে থাকার হারও ২০২২ সালের তুলনায় এখন অনেকটাই কমে গেছে। এ বছর ইলিশের রেণু পোনা ৫০ শতাংশ হ্যাচিং হার, অর্থাৎ ১০০টি ডিমের মধ্যে অর্ধেক রেণু পোনা বেঁচে থাকার হিসাবে ৪ লাখ ২ হাজার ৭৫৮ কোটি রেণু পোনা জলাশয়ে এলেও ১০ শতাংশ বেঁচে থাকার হারে জাটকা হয়েছিল ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে তা কমে ডিম উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজি, ইলিশের রেণু পোনা হয় ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮২ কোটি এবং এ থেকে জাটকা উৎপাদন হয় ১০ শতাংশ বেঁচে থাকার হারে ৩৯ হাজার ৫৭৮ কোটি। এখন ইলিশ উৎপাদন তুলনামূলক কমায় নানা শঙ্কায় মৎস্যসংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদন হ্রাসের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে দায়ী করছেন। চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটের মৎস্য সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগের মতো শীত বা কালবৈশাখী ঝড়ের দেখা মিলছে না। এছাড়া নদীর নাব্যতা হ্রাস, ডুবচর সৃষ্টি, পানি দূষণ এবং সাগরে অবৈধ ট্রলি ও নদীতে রিং জালের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীতে স্রোতের অভাবকেও তিনি একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। অমরেশ দত্ত জয়, চাঁদপুর ||।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ জানান, গত দুই বছরে উৎপাদন হ্রাসের হার অনেক বেশি। তিনি বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবাধে মাছ ধরা বন্ধ এবং নদীর নাব্যতা ফেরানোর মতো সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই ধারা পরিবর্তন করা কঠিন। বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠান ‘পপুলেশন ডায়নামিক্স অ্যান্ড স্টক অ্যাসেসমেন্ট অব টেনুআলুসা ইলিশা ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অধীনে ইলিশের আকার, দৈর্ঘ্য ও ওজন নিয়ে কাজ করছে। গবেষকরা এখন নির্দিষ্ট করছেন, কোন আকারের ইলিশ ধরা বা আহরণ করা উচিত, যাতে বংশধারা বিলুপ্ত না হয়। পূর্বে ২৫ সেন্টিমিটারের নিচে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নতুন গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে সরকার প্রয়োজনে এ বিষয়ে নীতিমালা পরিবর্তন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন গবেষণাই পারে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, ইলিশ গভীর জলের মাছ, কিন্তু নদীতে এখন প্রয়োজনীয় গভীরতার অভাব স্পষ্ট। তিনি বলেন, প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি কারেন্ট জাল, রিং জাল ও সব ধরনের ক্ষতিকর জাল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা জরুরি। এছাড়া নদীদূষণ রোধে গবেষণার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। গবেষক ও মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, লোকবল সংকট কাটিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ ও জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে ইলিশের উৎপাদন পুনরায় বৃদ্ধি করা সম্ভব।